ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা শুধু ফুসফুস বা মস্তিষ্কের ওপরই প্রভাব ফেলে না, পুরুষের প্রজননক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ বা ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালি সংকুচিত হয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টির কারণে শুক্রাণুর মান কমে যেতে পারে। তবে এ সমস্যার চিকিৎসায় শুক্রাণুর গতিশীলতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
‘স্লিপ মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমে শ্বাসকষ্টের সমস্যা পুরুষত্বহীনতা না ঘটালেও শুক্রাণুর গুণগত মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চীনের ইউনিভার্সিটি অব হংকং-শেনজেন হাসপাতালের গবেষকদের পরিচালিত এ গবেষণায় চিকিৎসা না নেওয়া স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত প্রজননক্ষম ৭২ জন পুরুষের সঙ্গে ২২ জন সুস্থ পুরুষের তুলনা করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ঘুমের সমস্যায় আক্রান্ত পুরুষদের বীর্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তাদের বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যাও কম ছিল। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বেশি মাত্রায়। গবেষকদের মতে, রাতে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসপ্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটা এবং অক্সিজেনের ঘাটতির সঙ্গে শুক্রাণুর গতিশীলতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
শুক্রাণুর এসব বৈশিষ্ট্য কারো সন্তান জন্মদানের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে, আবার নাও পারে। তবে এগুলো পুরুষের প্রজননক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। গবেষণাটির একটি আশাব্যঞ্জক দিক হলো, চিকিৎসার মাধ্যমে শুক্রাণুর গতিশীলতার উন্নতি দেখা গেছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ২৫ জন রোগীকে কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার বা সিপ্যাপ যন্ত্রের সাহায্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তারা প্রতি রাতে অন্তত চার ঘণ্টা করে যন্ত্রটি ব্যবহার করেন। এক মাস পর দেখা যায়, তাদের প্রগ্রেসিভ গতিশীল শুক্রাণুর হার প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, চিকিৎসার পর শুক্রাণুর সামনের দিকে এগিয়ে চলার সক্ষমতা বেড়েছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা, সিপ্যাপ থেরাপি ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালি খোলা রাখতে সহায়তা করে। এতে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা ও অক্সিজেনের ঘাটতি কমে। ফলে শুক্রাণুর গতিশীলতার উন্নতি হতে পারে। তবে এ উন্নতির দীর্ঘমেয়াদি প্রজননগত সুফল নিশ্চিত করতে আরো বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন বলে তারা জানিয়েছেন।
অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি সমস্যা, যাতে ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালি সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে জোরে নাক ডাকা এবং মাঝেমধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। ৩০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি চারজন পুরুষের একজন এ সমস্যায় ভোগেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি শুধু শারীরিক ক্লান্তিই বাড়ায় না, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকিও তৈরি করে।
আগের কিছু গবেষণায় স্লিপ অ্যাপনিয়ার সঙ্গে পুরুষত্বহীনতার সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও শুক্রাণুর ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না। ২০২৫ সালে ব্রাজিলের ইউরোলজিস্টরা ‘নেচার রিভিউজ ইউরোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক লেখায় পুরুষের বন্ধ্যাত্ব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ঘুমসংক্রান্ত চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
নতুন গবেষণাটি তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে পরিচালিত হলেও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে ঘুমের সমস্যার প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। গবেষকদের উপসংহার, ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা এবং বীর্যের অভ্যন্তরীণ প্রদাহজনিত পরিবেশ যৌথভাবে শুক্রাণুর কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। এ চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি প্রজননগত সুফল নিশ্চিত করতে আরো বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন। সূত্র: সায়েন্স এলার্ট
সানা/আপ্র/৭/১১/২০২৬