দেশজুড়ে অত্যন্ত সংক্রামক হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া এই রোগটি হঠাৎ করে ফিরে আসায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, শয্যা সংকট এবং আইসোলেশন ব্যবস্থার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এ অবস্থায় সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা নয়-বিকেন্দ্রীভূত চিকিৎসা ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু পরিস্থিতি: চলতি বছরের শুরুতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও কিছু বস্তি এলাকায় হামের সংক্রমণ প্রথম শনাক্ত হলেও রাজশাহীতে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ওই সব শিশুর সব মৃত্যুই হামের কারণে হয়নি। তবে গত ১৯ দিনে সারা দেশে অন্তত ৯৪ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হাসপাতালগুলোতে রোগী ভিড়ের কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে।
রাজশাহী ও কুষ্টিয়ায় ভয়াবহ পরিস্থিতি: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ১৪৯ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ পর্যন্ত সেখানে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৭৭ জন ভর্তি হয়েছে এবং ৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে কুষ্টিয়ায় ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে আরো ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জেলায় এখন পর্যন্ত হামের সংক্রমণে ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। বর্তমানে কুষ্টিয়ায় ২৩০ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
চট্টগ্রামে নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যু: চট্টগ্রামে নতুন করে ২৮ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। জেলায় মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯ জনে। এখন পর্যন্ত সেখানে ১২ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ২৯ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ২৮ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু: দেশজুড়ে হামের বিস্তার রোধে সরকার জরুরি ভিত্তিতে হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে। রোববার (৫ এপ্রিল) সকাল থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম ধাপে পাঁচ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে। পরে ধাপে ধাপে সারাদেশে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। আগামী একুশে মে’র মধ্যে কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের প্রস্তুতি ও ঘোষণা: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড ও ভেন্টিলেটর ব্যবস্থা বাড়ানো হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামে আক্রান্ত বা জ্বরাক্রান্ত শিশুদের এই সময়ে টিকা না দিয়ে সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়া হবে। আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা কমাতে ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বড় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় সংক্রমণ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সম্প্রসারণ এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্তের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁরা আরো বলেছেন, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থাসহ নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট তৈরি করা না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। দেশজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে এখন টিকাদান কর্মসূচি ও সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় ভরসা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সানা/আপ্র/৪/৪/২০২৬