চলতি বছরের মার্চ মাসে সারাদেশে রাজনেতিক ও নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন ৯১২ জনের বেশি বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ।
শনিবার (৪ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে মার্চ মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ১১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮ জন। আর ৯১২ জন আহত হন। মার্চ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা তুলনামূলক কমলেও নিহতের সংখ্যা ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৪৬টি “রাজনৈতিক সহিংসতার’’ ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১০ জন।
সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ মাসে সহিংসতার ১১৩টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৪৫টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫০১ জন ও নিহত হয়েছেন ৯ জন। ১৬টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১০৯ জন ও নিহত হয়েছেন ৫ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে হওয়া ২২টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৫৬ জন এবং নিহত হয়েছেন দুই জন।
বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে হওয়া দুটি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১ জন, ২১টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৯ জন।
এছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে ৭টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯৬ জন ও নিহত হয়েছেন ২ জন। নিহত ১৮ জনের মধ্যে বিএনপির ১৩ জন, জামায়াতের ২ জন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলের ২ জন ও একজন সাধারণ মানুষ।
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৮ জনের মধ্যে একজন নারী, একজন কিশোর ও একজন সাধারণ মানুষ রয়েছেন।
সংগঠনটি বলছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া দুষ্কৃতকারীদের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলায় বিএনপির ৫ জন ও আওয়ামী লীগের একজন নিহত হয়েছেন এবং ৮ জন আহত হয়েছেন।
তাছাড়া সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক অন্তত ২৮টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৩০টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার তথ্য উল্লেখ করে আরো বলা হয়, সারাদেশে অন্তত ৯টি সহিংসতার ঘটনায় ১০৯ জন আহত ও তিন জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে একজন আহত ও একজন নিহত এবং অন্যান্য দলের মধ্যে দুই সংঘর্ষে দুই জন আহত হন।
এছাড়া, মার্চ মাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ২৮টির অধিক মামলা হয়েছে। এ সব মামলায় ৩০৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১২৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। এ মাসে রাজনৈতিক মামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ২২৫ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অন্তত ১১০ জন, বিএনপির ৮৫ জন এবং জামায়াতের ২০ জন ও জাতীয় নাগরিক পার্টির ৮ জন।
এছাড়া সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতায় সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ২৫ ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৮ জন।
সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে ৩৪ হামলার ঘটনায় ৫৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৩ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৩ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১২ জন সাংবাদিক।
এছাড়াও একজন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশের অধীনে ৮ সাংবাদিকের নামে পৃথক দুইটি মামলা হয়।
মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ৮টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দেয়। এতে ৮১ জনের বেশি মানুষ আহত হন- যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারী ছিলেন।
এছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক দুই মামলায় ৮ সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রকমানকে নিয়ে সমালোচনায় একজন ও ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাতের অভিযোগে দুই জনকে আটক করা হয়। এমনকি পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ফেসবুকে বিএনপি নেতা জহিরুল ইসলামের বিরূদ্ধে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ায় মো. ইদ্রিস (৪৫) নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিচার বহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
এছাড়া, সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ১২ জন আসামি মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ২ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের এবং ১০ জন্য সাধারণ কয়েদী ছিলেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ১০টি হামলার ঘটনায় ৫ জন আহত হয়েছে। এছাড়া তিনটি মন্দির, একটি প্রতিমা এবং তিনটি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, মার্চ মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৪টি হামলার ঘটনায় ৪ জন আহত হয়েছেন এবং ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একজনকে আটক করা হয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ৫টি সহিংসতার ঘটনায় ১জন আহত ও ২৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে ৭৭ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১৭৬ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৩৮ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন।
এছাড়া রাজধানীর বনানীতে একটি বহুতল ভবনের তিনতলা থেকে ফেলে পিংকী (১৫) নামে এক গৃহকর্মীকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
মার্চ মাসে ২৭৩ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ মাসে ৭২ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। গণ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৬ জন নারী ও কন্যা শিশু। এছাড়া ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ৫ জনকে যাদের মধ্যে শিশু ৩ জন এবং ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১ জন। ৫৩ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ২৩ জন।
এছাড়া পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৫১ জন, আহত হয়েছেন ৪৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৪৩ জন নারী। এমনকি যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩ আহত হয়েছেন ৪ জন নারী।
অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ১৭৬ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৬৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১১২ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চিকিৎসা অব্যবস্থাপনা, আইসিইউ সংকট, হামের উপসর্গে গত মাসে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে অন্তত ৫১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে।
এসময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরো জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।
সানা/আপ্র/৪/৪/২০২৬