প্রায় ১৩ মাস কারাভোগের পর অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা ১২টি মামলায় উচ্চ আদালতের দেওয়া জামিন বহাল রাখার পর বুধবার (৩ জুন) রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, রাত সোয়া ১০টার দিকে আইভী কারাগার থেকে বের হন। এ সময় কারাফটকে তাঁর আইনজীবী ও স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। মুক্তির পর তিনি কোনো বক্তব্য না দিয়ে একটি গাড়িতে করে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন।
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার শিরিনা আক্তার জানান, সন্ধ্যায় আইভীর জামিনসংক্রান্ত নথিপত্র কারাগারে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া ১২টি মামলায় উচ্চ আদালতের দেওয়া জামিন আপিল বিভাগেও বহাল থাকায় মুক্তির আইনি বাধা দূর হয়।
আইভীর আইনজীবী মো. আওলাদ হোসেন বলেন, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো ভিত্তিহীন। মামলাগুলোর সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন। দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় কারাবন্দি থাকার পর সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ আদালত জামিন দিলেও রাষ্ট্রপক্ষ একাধিকবার সেই আদেশ স্থগিত বা বাতিলের আবেদন করে। তবে শুনানি শেষে আপিল বিভাগ ধারাবাহিকভাবে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখায় আইভীর মুক্তির পথ সুগম হয়।
২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার নিজ বাসভবন ‘চুনকা কুটির’ থেকে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত তিনটি হত্যা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ একাধিক মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকটি মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়।
মামলাগুলোতে একাধিক দফায় জামিন পেলেও নতুন নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর কারণে তাঁর মুক্তি বারবার বিলম্বিত হয়। এ পরিস্থিতিতে গ্রেফতার দেখানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট আবেদনও করেন তিনি।
চলতি বছরের ১০ মে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ১০টি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে আরো দুটি মামলায় হাইকোর্ট জামিন দিলে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলেও শেষ পর্যন্ত সেই জামিনও বহাল থাকে।
এক পর্যায়ে উচ্চ আদালত রুল জারি করে জানতে চান, শুধু হয়রানি ও অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে আবেদনকারীকে বারবার বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া তাঁকে নতুন করে গ্রেফতার না দেখানো এবং হয়রানি না করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়।
আইভীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পাঁচটি মামলায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রথম দফায় জামিন মঞ্জুর করেন হাইকোর্ট। পরে আরো পাঁচটি মামলায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জামিন পান তিনি। এসব জামিনাদেশ স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলেও শুনানি শেষে আপিল বিভাগ সবগুলো মামলায় তাঁর জামিন বহাল রাখে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টানা তিনটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। দেশের অন্যতম আলোচিত নারী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত আইভীর প্রায় ১৩ মাস পর কারামুক্তি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সানা/আপ্র/৪/৬/২০২৬