পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের দুই দিন পর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে বক্তব্য দিয়েছেন রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি পার্বত্যাঞ্চলের জনগণকে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিএনপির প্রতি নিজের অটুট আনুগত্য এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বুধবার (৩ জুন) রাত ৯টার দিকে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া ওই পোস্টে দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। পদত্যাগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আবেগ, উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।
পোস্টের শুরুতে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষায় শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি পাহাড়ি, বাঙালি ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কোনো ধরনের উসকানি, বিভ্রান্তি বা সংঘাতের পথে না গিয়ে সবাইকে ধৈর্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
দীপেন দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সকলের এবং এই অঞ্চলের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষার দায়িত্বও সবার। পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা আরো সুদৃঢ় হোক—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর পিতা সুবিমল দেওয়ান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা ছিলেন। পিতার আদর্শ, দেশপ্রেম এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রধান প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন এবং রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে দলটির একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে কাজ করে আসছেন।
দীপেন দেওয়ান বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের ঠিকানা। ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক যেকোনো পরিস্থিতিতেই দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য ও অঙ্গীকার অটুট থাকবে এবং তিনি কখনো বিএনপি ত্যাগ করবেন না।
পোস্টে তিনি আরো বলেন, ব্যক্তি নয়, জনগণের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন, শান্তি ও সম্প্রীতির স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বিভেদ নয়; প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু সংঘাত নয়। পাহাড়ি ও বাঙালি সব সম্প্রদায়ের মানুষ যেন শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা।
পোস্টের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে দীপেন দেওয়ান বলেন, নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করে যেতে চান। একই সঙ্গে তিনি পুনরায় ঘোষণা করেন, বিএনপিই তাঁর শেষ রাজনৈতিক ঠিকানা।
ঈদের ছুটি শেষে সরকারি কার্যক্রম শুরু হওয়ার দিন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন দীপেন দেওয়ান। পদত্যাগপত্রে তিনি শারীরিক অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে দায়িত্ব পালন ব্যাহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনায় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছিল। সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরুর প্রায় সাড়ে তিন মাসের মাথায় তাঁর এই পদত্যাগ রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
একসময় বিচার বিভাগে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দীপেন দেওয়ান ২০০৫ সালে চাকরি ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০১০ সালে তিনি রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহধর্মবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান এবং বর্তমানে সেই পদেই রয়েছেন।
সানা/আপ্র/৪/৬/২০২৬