দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে চারটি জেলায় হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মোট ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মৃতদের মধ্যে বরগুনা সদরে ৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে ১ জন, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় ১ জন এবং রাজশাহীতে ৫ জন শিশু রয়েছে।
বরগুনায় ‘রেড জোন’ ঘোষণা, সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে: বরগুনায় হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সদর উপজেলাকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলায় ইতোমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে ৩ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। পরীক্ষাগারে পাঠানো নমুনার প্রায় ৩০ শতাংশে হামের উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এখন পর্যন্ত জেলায় সন্দেহভিত্তিক রোগীর সংখ্যা ১৩২ জন। এর মধ্যে ৭৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৫ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১২২ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৭ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু: ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শান্তিবাগ এলাকায় হামে আক্রান্ত হয়ে ৭ বছর বয়সী শিশু অমরাতের মৃত্যু হয়েছে। নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। জেলায় বিভিন্ন বয়সের ৫১ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
ডিমলায় ১১ দিন বয়সী নবজাতকের মৃত্যু: নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ দিন বয়সী নবজাতক আফরিন জান্নাতের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, শিশুটিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে নমুনা সংগ্রহের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
রাজশাহীতে এক দিনে ৫ শিশুর মৃত্যু: রাজশাহীতে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ জন এবং বেসরকারি সিডিএম হাসপাতালে ৩ জন শিশু মারা গেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, মৃত শিশুদের বয়স ছিল ৬ ও ৭ মাস। তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। বর্তমানে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ১২৫ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে ৩৯১ জন রোগী ভর্তি হয়েছে এবং ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় আরও এক শিশুর মৃত্যু: কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুটির বয়স ৬ মাস। নাম আবু রায়হান। সে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটস হরিপুর এলাকার বাসিন্দা। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। গত তিন দিনে জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় পরিস্থিতির অবনতি: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ৯৭৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে সন্দেহভিত্তিক রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৬১০ জন। এর মধ্যে ৯২৯ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে ১১৩ জনের মৃত্যু সন্দেহভিত্তিক হিসেবে রিপোর্ট করা হলেও নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। বিভাগভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ঢাকা বিভাগে ৩ হাজার ২৫৯ জন, যার মধ্যে ৪৬৮ জন নিশ্চিত রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৫৪ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
ল্যাবে শনাক্তের হার ৩৫ শতাংশে: মহাখালী জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে গড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ নমুনায় হাম শনাক্ত হচ্ছে।
গত কয়েক দিনের পরীক্ষায় দেখা যায়—
* ৩১ মার্চ: ১৪১ নমুনায় ৭১ পজিটিভ
* ১ এপ্রিল: ১৮৯ নমুনায় ৬৪ পজিটিভ
* ২ এপ্রিল: ২৮৮ নমুনায় ১০৬ পজিটিভ
* ৩ এপ্রিল: ২৮৫ নমুনায় ৬৯ পজিটিভ
* ৪ এপ্রিল: ১৪৬ নমুনায় ৭০ পজিটিভ
৫ এপ্রিল বিকেল পর্যন্ত ৩৬০টি নমুনা জমা পড়ে, যা ল্যাবের সক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি: দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আগামী ৩ মে থেকে সারাদেশে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
সানা/আপ্র/৫/৪/২০২৬