গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

তামাকের ধোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের সোনালি স্বপ্ন

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:৩৩ পিএম, ০৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ০২:০১ এএম ২০২৬
তামাকের ধোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের সোনালি স্বপ্ন
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ড. সৈয়দ হুমায়ুন কবির

পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস এলেই আমরা যখন শ্রমিকের মজুরি, কাজের নিরাপত্তা কিংবা কর্মঘণ্টা নিয়ে আলোচনা করি, তখন প্রায়ই একটি অদৃশ্য কিন্তু ভয়াবহ সংকটের বিষয়টি উপেক্ষা করে যাই- আর তা হলো শ্রমিকদের মধ্যে ধূমপান ও তামাকের ভয়াবহ বিস্তার।

শ্রমিকদের মধ্যে ধূমপান ও তামাকের উচ্চহার কেবল একটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত বিচ্যুতি নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এক নীরব অন্তরায়। শ্রমিকদের ফুসফুস যদি সুস্থ না থাকে, তবে একটি দেশের শিল্পকারখানার চাকা সচল থাকা অসম্ভব।

একজন শ্রমিকের কর্মক্ষমতা সরাসরি তার ফুসফুসের কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, ধূমপানের ফলে ফুসফুসের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা বা লাং ক্যাপাসিটি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়। ধূমপানের ধোঁয়া ফুসফুসের বায়ুনালীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি এবং শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগের জন্ম দেয়। একজন ধূমপায়ী বা তামাক গ্রহণকারী শ্রমিক দীর্ঘ সময় কাজ করলে খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। নিকোটিনের ওপর নির্ভরশীলতা শ্রমিকের শারীরিক সক্ষমতাকে সীমিত করে দেয়। দিনের কাজের ফাঁকে ফাঁকে তামাকের তাড়না শ্রমিকের মনোযোগ বিঘ্নিত করে এবং কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট করে।

যখন কোনো কারখানার বড় অংশের শ্রমিক ধূমপান বা তামাজজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন বা দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক দুর্বলতার কারণে কাজে ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে পড়েন, তখন তা সামগ্রিক শিল্প উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। তাই শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের শিল্পখাতের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে প্রায়ই একটি ভুল ধারণা প্রচলিত থাকে যে, কঠোর পরিশ্রমের ক্লান্তি দূর করতে বা কাজের উদ্দীপনা পেতে ধূমপান, তামাক, জর্দা, গুল, প্রয়োজন। এটি একটি মারাত্মক ভ্রান্ত ধারণা। ধূমপান তাৎক্ষণিক নিকোটিনিক স্টিমুলেশন দিলেও, রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ কমিয়ে দিয়ে শরীরকে দীর্ঘমেয়াদে আরও ক্লান্ত করে তোলে। দারিদ্র্যের দোহাই দিয়ে অনেক শ্রমিক ধূমপানকে সস্তা বিনোদন বা মানসিক প্রশান্তির উপায় হিসেবে বেছে নিলেও, প্রকৃতপক্ষে একজন শ্রমিকের দৈনিক আয়ের একটি বড় অংশ তামাকজাত পণ্যের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। একটি নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই অর্থের গুরুত্ব অপরিসীম। এই অর্থ দিয়ে পরিবারের জন্য পুষ্টিসম্মত খাবার কিংবা শিশুদের শিক্ষার খরচ অনায়াসেই মেটানো সম্ভব ছিল। তামাকের পেছনে এই অপচয় অভাবের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেয়; যা শ্রমিকের মনে এক ধরনের স্থায়ী মানসিক চাপ বা স্ট্রেস তৈরি করে। ওই মানসিক চাপ কাটাতে তারা আবার ধূমপান বা তামাকের দিকেই ঝুঁকে পড়েন। এটি একটি চক্রাকার বিষবৃক্ষ, যা শ্রমিককে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের গোলকধাঁধায় আটকে রাখে।

তামাক গ্রহণের ফলে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। দেশে প্রতিদিন তামাকজনিত নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে গড়ে চার শতাধিক বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে; যার বড় একটি অংশই নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তামাকজাত পণ্যের আগ্রাসনের প্রভাবে হৃদরোগ, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, ক্রনিক শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ অসংখ্য প্রতিরোধযোগ্য মরণব্যাধি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন শ্রমজীবীরা- যা অনেক পরিবারকে অপ্রত্যাশিত সংকটে ফেলে দিচ্ছে।

পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে পুরো পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যায়, শুরু হয় চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। সন্তানদের শিক্ষা, খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যাহত হয় এবং পরিবার দারিদ্র্যের গভীরে তলিয়ে যায়। এভাবে তামাক শুধু স্বাস্থ্য নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবেও শ্রমজীবী পরিবারকে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

শ্রমিকদের ধূমপান ও তামাকের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য শিক্ষা, তামাকবিরোধী প্রচারণা এবং সহজলভ্য পরামর্শ সেবা নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

একই সঙ্গে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ধূমপানমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সহজ হবে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে তামাকের ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং একটি সুস্থ ও নিরাপদ জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

লেখক: জনস্বাস্থ্য ও ক্যানসার প্রতিরোধ গবেষক এবং সভাপতি ওয়ার্ল্ড ক্যানসার সোসাইটি বাংলাদেশ

আপ্র/কেএমএএ/০৩.০৫.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

একদিনে হামের উপসর্গে আরো ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩১৫
২৯ অক্টোবর ২০২৬

একদিনে হামের উপসর্গে আরো ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩১৫

দেশে ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরো ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০৫ জন এবং হামের উ...

অতিরিক্ত লবণে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে লিভার
২৯ অক্টোবর ২০২৬

অতিরিক্ত লবণে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে লিভার

স্বাস্থ্য প্রতিদিন----------------------

ওসমানী হাসপাতালে সাংবাদিকদের মাথা ফাটালেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ওসমানী হাসপাতালে সাংবাদিকদের মাথা ফাটালেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের...

ডেঙ্গুতে একদিনে কেড়ে নিলো ৯ প্রাণ
২৮ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গুতে একদিনে কেড়ে নিলো ৯ প্রাণ

চলতি মাসে চরম ভয়াবহতা ছড়িয়ে চলেছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই এডিস মশাবাহিত এ ভাইরাসটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ম...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে