গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

স্বাস্থ্য প্রতিদিন===

বাংলাদেশে ভ্যাপিংয়ের নীরব ছোবল ও তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য

স্বাস্থ্য ডেস্ক

স্বাস্থ্য ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:০১ পিএম, ২০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২২:৫৯ এএম ২০২৬
বাংলাদেশে ভ্যাপিংয়ের নীরব ছোবল ও তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ডা. ফারাহ সাবরিনা

বাংলাদেশে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের বিস্তার এখন আর কেবল একটি জীবনধারাগত প্রবণতা নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত যেখানে জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ভ্যাপিং সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে, সেখানে বাংলাদেশে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতি ছয়জনের একজন বর্তমানে ভ্যাপ ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ আবার ‘ডুয়াল ইউজার’ যারা একইসঙ্গে সিগারেট ও ভ্যাপিং করেন। এই প্রবণতা শুধু নিকোটিন নির্ভরতা বাড়াচ্ছে না, বরং আসক্তিকে আরও জটিল করে তুলছে। গবেষণার ফলাফল আরো উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক সামনে আসে। ভ্যাপিং ও ধূমপান উভয়ই ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাইকোলজিক্যাল ডিস্ট্রেস ও বিষণ্নতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একইভাবে শুধুমাত্র ভ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি পাওয়া গেছে। এই তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, ভ্যাপিংকে ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে দেখার ধারণাটি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ভ্যাপিং ও মানসিক স্বাস্থ্য: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ক্রস-সেকশনাল জরিপ শীর্ষক এই গবেষণাটি দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১,৬১৫ জন ১৮-২৫ বছর বয়সী স্নাতক শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত হয়। এর মধ্যে পাঁচটি সরকারি এবং দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রতি ছয়জনের একজন ভ্যাপ ব্যবহারকারী: গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ১৫.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত ভ্যাপিং করেন। এর মধ্যে ৬.২ শতাংশ শুধুমাত্র ভ্যাপ ব্যবহার করেন, আর ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ভ্যাপ ও প্রচলিত সিগারেট উভয়ই ব্যবহার করেন। উদ্বেগজনকভাবে, ভ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ উচ্চমাত্রার নিকোটিনযুক্ত ই-লিকুইড ব্যবহার করেন, যা আসক্তির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। ভ্যাপিং শুরু করার প্রধান কারণ হিসেবে ৩৭.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কৌতূহলকে দায়ী করেছেন। ২৬.২ শতাংশ জানিয়েছেন বন্ধুদের প্রভাব, আর ১৮.৫ শতাংশ সামাজিক ট্রেন্ড ও লাইফস্টাইল অনুসরণের কারণে শুরু করেছেন। প্রায় ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ভুলভাবে মনে করেন যে ভ্যাপিং প্রচলিত সিগারেটের তুলনায় কম ক্ষতিকর।

ফ্লেভার ও সামাজিক প্রভাবেই আকর্ষণ: ম্যাঙ্গো, স্ট্রবেরি, আপেলসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় ফ্লেভার, রঙিন ডিজাইন এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া তৈরির সুযোগ তরুণদের ভ্যাপিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট করছে। এসব উপাদান অনেক শিক্ষার্থীকে কৌতূহল ও সামাজিক প্রভাবে ভ্যাপিং শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করছে, যা পরবর্তীতে নিকোটিন নির্ভরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ভ্যাপিং ও মানসিক স্বাস্থ্যের শক্তিশালী সম্পর্ক: গবেষণায় দেখা গেছে, ভ্যাপিং এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে একটি উদ্বেগজনক সম্পর্ক বিদ্যমান। যারা ভ্যাপিং ও ধূমপান উভয়ই করেন, তাদের মধ্যে মানসিক চাপ বা সাইকোলজিক্যাল ডিস্ট্রেসের হার ৮০.৫ শতাংশ এবং বিষণ্নতার হার ৬৩.৮ শতাংশ। শুধুমাত্র ভ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যেও বিষণ্নতা ৬০.৮ শতাংশ এবং তীব্র উদ্বেগ ৫৬. ৯ শতাংশ পাওয়া গেছে।

নিকোটিনের স্নায়বিক প্রভাব: বিশেষজ্ঞদের মতে, নিকোটিন কিশোর ও তরুণদের মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারকে প্রভাবিত করে, যা আবেগ ও মানসিক স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি এবং আসক্তির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি: গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ভ্যাপিংয়ের সঙ্গে মাদক ও অ্যালকোহল ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি শারীরিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, মাথা ঘোরা, বুক ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ক্ষুধামন্দা, ওজন হ্রাস এবং মাথাব্যথার মতো উপসর্গও রিপোর্ট করা হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের প্রয়োজন: এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে সহজে ও গোপনীয়ভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা বা মোবাইল হেলথ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যাপভিত্তিক কাউন্সিলিং, এসএমএস রিমাইন্ডার এবং ডিজিটাল আচরণগত সহায়তা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের নিকোটিন নির্ভরতা কমাতে এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিদ্যমান মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সিলিং সেবা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। গবেষকরা আশা প্রকাশ করেছেন, এই গবেষণার ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করবে, যাতে তরুণদের মধ্যে ভ্যাপিং, মাদক ব্যবহার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায়।

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন: ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’ আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’ অনুমোদন করে। অধ্যাদেশে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো এবং সব ধরনের ইমার্জিং তামাক পণ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। যা পরবর্তীতে মহান সংসদে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন ২০২৬-এ রূপান্তরিত হয়- যেখান থেকে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো এবং সব ধরনের বিকাশমান নিকোটিন পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এর পাশাপাশি এই পণ্যকে কর আরোপের মাধ্যমে দেশের বাজারে বিক্রয়-ক্রয়ে বৈধতা দেওয়ার ফলে এই পণ্য সহজলভ্য হবে এবং তরুণদের মধ্যে বিস্তার লাভ করবে।

লেখক: জনস্বাস্থ্য গবেষক

কেএমএএ/আপ্র/২০.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে জীবনযাপনে যেসব পরিবর্তন জরুরি
২৯ অক্টোবর ২০২৬

স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে জীবনযাপনে যেসব পরিবর্তন জরুরি

বয়স বৃদ্ধি ও বংশগত ইতিহাস স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি রোগ...

একদিনে হামের উপসর্গে আরো ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩১৫
২৯ অক্টোবর ২০২৬

একদিনে হামের উপসর্গে আরো ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩১৫

দেশে ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরো ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০৫ জন এবং হামের উ...

অতিরিক্ত লবণে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে লিভার
২৯ অক্টোবর ২০২৬

অতিরিক্ত লবণে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে লিভার

স্বাস্থ্য প্রতিদিন----------------------

ওসমানী হাসপাতালে সাংবাদিকদের মাথা ফাটালেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ওসমানী হাসপাতালে সাংবাদিকদের মাথা ফাটালেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে