গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস আজ

দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ আক্রান্ত, নবজাতকের ‘বার্থ ডোজ’ চালুর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:২১ পিএম, ২৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৫:৫৩ এএম ২০২৬
দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ আক্রান্ত, নবজাতকের ‘বার্থ ডোজ’ চালুর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
ছবি

প্রতীকী ছবি

অনন্য হক: আজ ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। তবে দিবসটির তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি এমন এক ‘নীরব ঘাতক’ সম্পর্কে সতর্ক করার দিন, যা বছরের পর বছর উপসর্গ ছাড়াই মানুষের লিভার ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়, ভাইরাল হেপাটাইটিস এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ এবং লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণগুলোর একটি।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, জনসচেতনতার ঘাটতি, দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া এবং টিকাদান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এখনো প্রায় এক কোটির ঘরে রয়েছে। তারা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশ্ব পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়েছে, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ মিলিয়ে প্রতিবছর বিশ্বে আনুমানিক ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এদের বেশিরভাগই লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। হেপাটাইটিসজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৯৫ শতাংশই ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসের কারণে ঘটে।

এ বছরের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য ‘হেপাটাইটিস: চলুন বাধা ভেঙে দিই’। এর মূল বার্তা হলো—সচেতনতার অভাব, সামাজিক কুসংস্কার, পরীক্ষা ও চিকিৎসায় বৈষম্য দূর না করলে নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ে বসবাস করছেন। শুধু ২০২৪ সালেই এ অঞ্চলে আনুমানিক ২ লাখ ৬৬ হাজার নতুন হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ সংক্রমণএবং প্রায় ২ লাখ হেপাটাইটিসসম্পর্কিত মৃত্যু ঘটেছে।

বাংলাদেশ কেন ঝুঁকিতে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, বাংলাদেশ হেপাটাইটিস ‘সি’ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের একটি। একই সঙ্গে হেপাটাইটিস ‘বি’জনিত মৃত্যুর উচ্চঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকাতেও রয়েছে বাংলাদেশের নাম।

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, হেপাটাইটিস সাধারণত ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ ও ‘ই’—এই পাঁচ ধরনের ভাইরাসের কারণে হয়।

তার ভাষায়, “হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক লিভার বিকল হয়ে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”

তিনি জানান, দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। তবে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ সংক্রমণের নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান এখনো নেই।


শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো **মা থেকে নবজাতকের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণ**। অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, “জন্মের সময় বা শিশু বয়সে আক্রান্ত হলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিসে পরিণত হয়** এবং আক্রান্তদের প্রায় **২০ থেকে ২৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মারা যেতে পারে।”

এ কারণেই জনস্বাস্থ্যবিদরা জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’র ‘বার্থ ডোজ’ টিকা চালুর ওপর জোর দিচ্ছেন।

জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ. বারী বলেন, “হেপাটাইটিস প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগ শনাক্ত হওয়া এবং টিকা নিশ্চিত করা। এর জন্য সবার আগে শিশুদের বার্থ ডোজ চালু করতে হবে।”

তিনি জানান, জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম ডোজ, এরপর এক মাস ও ছয় মাস বয়সে পরবর্তী ডোজ দিতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা দেওয়া হলেও সার্বজনীন বার্থ ডোজ এখনো চালু হয়নি।

তার মতে, ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নবজাতকদের অন্তত ৯০ শতাংশকে জন্মের প্রথম দিনেই এই টিকার আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে দ্রুত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোও এ উদ্যোগে সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।”

রোগ ছড়ায় যেভাবে
হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ মূলত রক্ত, রক্তের উপাদান, অনিরাপদ সূঁচ, দূষিত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং শরীরের বিভিন্ন তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির শরীরে ব্যবহার, অননুমোদিত ক্লিনিক বা বিউটি পার্লারে জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ছাড়া চিকিৎসা বা প্রসাধনসেবা গ্রহণ—এসব কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অনেক মানুষ জানেনই না যে তারা আক্রান্ত। বহু বছর কোনো উপসর্গ না থাকলেও ভাইরাস ধীরে ধীরে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি করে। পরে তা সিরোসিস, লিভার বিকল হওয়া বা লিভার ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।

প্রতিরোধে যা জরুরি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর টিকা রয়েছে এবং এটি নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। হেপাটাইটিস ‘সি’ এখন আধুনিক ওষুধে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য হলেও এর জন্য এখনো কোনো প্রতিরোধক টিকা উদ্ভাবিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ—

* জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বার্থ ডোজ চালু করা

* গর্ভবতী নারীদের বাধ্যতামূলক হেপাটাইটিস ‘বি’ পরীক্ষা

* নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করা

* একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা

* ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিয়মিত স্ক্রিনিং

* নিরাপদ খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা


সরকারি উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি আহমেদ জামশিদ মোহাম্মদ বলেন, “অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, কারণ তাদের রোগ অনেক দেরিতে শনাক্ত হয় অথবা সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পান না।”

দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লিভার রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধা ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে। ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালসহ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম যুক্ত করার মাধ্যমে উন্নত লিভার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, যাতে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন কমে আসে।

এখনই প্রয়োজন জাতীয় জাগরণ
বাংলাদেশে লিভার রোগের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা জোরদার না করা হলে আগামী দশকে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের চাপ আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।

হেপাটাইটিস দিবস তাই কেবল একটি স্বাস্থ্য দিবস নয়; এটি রাষ্ট্র, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজের জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা। বিজ্ঞান ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় অস্ত্র দিয়েছে—কার্যকর টিকা, নির্ভুল পরীক্ষা ও উন্নত চিকিৎসা। এখন প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, ব্যাপক স্ক্রিনিং, সময়মতো টিকাদান এবং সবার জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা। নীরব এই ঘাতককে থামাতে আজকের উদ্যোগই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম কতটা নিরাপদ থাকবে।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্লোবাল হেপাটাইটিস রিপোর্ট ২০২৬, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৬ প্রচারাভিযান, ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত।
সানা/আপ্র/২৮/৭/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

একদিনে হামের উপসর্গে আরো ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩১৫
২৯ অক্টোবর ২০২৬

একদিনে হামের উপসর্গে আরো ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩১৫

দেশে ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরো ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০৫ জন এবং হামের উ...

অতিরিক্ত লবণে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে লিভার
২৯ অক্টোবর ২০২৬

অতিরিক্ত লবণে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে লিভার

স্বাস্থ্য প্রতিদিন----------------------

ওসমানী হাসপাতালে সাংবাদিকদের মাথা ফাটালেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ওসমানী হাসপাতালে সাংবাদিকদের মাথা ফাটালেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের...

ডেঙ্গুতে একদিনে কেড়ে নিলো ৯ প্রাণ
২৮ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গুতে একদিনে কেড়ে নিলো ৯ প্রাণ

চলতি মাসে চরম ভয়াবহতা ছড়িয়ে চলেছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই এডিস মশাবাহিত এ ভাইরাসটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ম...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে