চিকিৎসকদের নিষেধ উপেক্ষা করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) পরামর্শে মৃগী রোগের ওষুধ ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিয়েছিলেন এক তরুণী সফটওয়্যার প্রকৌশলী। এর কয়েক মাস পর নিজ অ্যাপার্টমেন্টে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় লাইসেন্স ছাড়া চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ওই তরুণীর মা-বাবা।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোয়েন ওয়ান (৩১) নামের ওই প্রকৌশলী চিকিৎসকদের না জানিয়েই চ্যাটজিপিটির পরামর্শে মৃগী রোগের জরুরি ওষুধ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করতে তাঁকে উৎসাহিত করার অভিযোগও আনা হয়েছে মামলায়।
আমাজনে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন বোয়েন। দীর্ঘদিন ধরে মৃগী রোগে ভুগছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসাজনিত ছুটিতেও ছিলেন। পরে আমাজন তাঁকে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নিলে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে নতুন চাকরির সাক্ষাৎকার দেওয়ার প্রয়োজন ছিল তাঁর।
বোয়েনের আশঙ্কা ছিল, মৃগী রোগের চিকিৎসায় নিয়মিত সেবন করা ওষুধের কারণে তাঁর কথা বলার গতি ধীর হয়ে যাচ্ছে। এতে চাকরির সাক্ষাৎকারে পিছিয়ে পড়তে পারেন বলে মনে করতেন তিনি। এ উদ্বেগ থেকেই চিকিৎসককে না জানিয়ে চ্যাটজিপিটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
২০২৫ সালে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে সপ্তাহে গড়ে দেড় হাজারেরও বেশি বার্তা আদান-প্রদান করেছিলেন বোয়েন। মা-বাবার সঙ্গেও এত বেশি কথা বলতেন না তিনি।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃগী রোগ ও দ্বিমেরু মানসিক ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ল্যামোট্রিজিন’ নামের ওষুধটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য বোয়েনকে বিস্তারিত সময়সূচি দিয়েছিল চ্যাটজিপিটি। চিকিৎসকদের না জানিয়ে ওষুধের মাত্রা অর্ধেক করার পরামর্শও দিয়েছিল। এমনকি চিকিৎসকদের সতর্কবার্তাকে ঝুঁকি এড়ানোর চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাটি।
বোয়েন নিজের শারীরিক জটিলতা ও মৃগী রোগের লক্ষণ নিয়ে বার্তা পাঠালে চ্যাটজিপিটি বারবার তাঁকে আশ্বস্ত করেছে বলেও নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ওষুধ বন্ধের ক্ষতিকর দিক ও এ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে অন্তত ১৫৮ বার প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। তবে তাঁর স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, বোয়েনের শারীরিক ইতিহাস বিবেচনায় কোনো অবস্থাতেই ওষুধ বন্ধের পরামর্শ দেওয়া উচিত ছিল না।
গত ফেব্রুয়ারিতে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বোয়েনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘মৃগী রোগে আকস্মিক মৃত্যু’। এ ঘটনায় তাঁর বাবা কুন ওয়ান ও মা মেইকিন জু একই দিনে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি বোয়েনকে চিকিৎসকদের নির্দেশ উপেক্ষা করতে উৎসাহিত করেছিল। চিকিৎসকদের অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা হিসেবে উপস্থাপন করার পাশাপাশি লাইসেন্স ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও আনা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। মামলায় আরো দাবি করা হয়েছে, বোয়েন চীনা ভাষায় চ্যাট করায় তাঁর চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে চ্যাটজিপিটি হয়তো স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেনি।
এ ঘটনাকে ‘হৃদয়বিদারক’ বলে বর্ণনা করেছেন ওপেনএআইয়ের একজন মুখপাত্র। তবে তাঁর দাবি, মামলায় চ্যাটজিপিটির যে পুরোনো সংস্করণের কথা বলা হয়েছে, সেটি এখন আর চালু নেই।
বোয়েন ‘জিপিটি-ফোর-ও’ মডেলটি ব্যবহার করতেন। চিকিৎসা পরীক্ষকদের ধারণা অনুযায়ী, তাঁর মৃত্যুর তারিখ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর পরদিনই ভোক্তা পর্যায়ের অ্যাপ থেকে মডেলটি সরিয়ে নেয় ওপেনএআই। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র দাবি করেন, বর্তমানের নতুন মডেলগুলো কোনো পরিস্থিতিতে জরুরি সহায়তার প্রয়োজন কি না, তা শনাক্ত করতে আগের তুলনায় বেশি দক্ষ।
এর আগে ‘জিপিটি-ফোর-ও’ মডেলটির অতিরিক্ত তোষামোদ ও ব্যবহারকারীর কথায় সহজে সম্মতি দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছিল। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ম্যাশএবলের প্রতিবেদনে বলা হয়, চ্যাটবটটির অতিরিক্ত তোষামোদকারী ও বিরক্তিকর আচরণের কারণে ২০২৫ সালের এপ্রিলে এর একটি হালনাগাদ সংস্করণ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান। সে সময় ব্যবহারকারীরা সতর্ক করে বলেছিলেন, যেকোনো কথায় সম্মতি জানানো এমন চ্যাটবট মানুষের বিভ্রান্তি কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যসংকট আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
বোয়েনের মৃত্যুর ঘটনা ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসাজনিত মৃত্যু ও অবহেলার অভিযোগে করা মামলার তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে ১৬ বছর বয়সী অ্যাডাম রেইনের পরিবার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করে। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়, চ্যাটজিপিটি রেইনের আত্মহত্যার চিন্তাভাবনাকে প্রশ্রয় দিয়েছিল।
তখন আদালতে দেওয়া বিবৃতিতে ওপেনএআই অভিযোগ অস্বীকার করে। প্রতিষ্ঠানটি ওই কিশোরের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ইতিহাস এবং ব্যবহারের শর্তাবলি লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরেছিল। এরপর একই বছরের নভেম্বরে আরো সাতটি মামলায় ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু ও আত্মহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
সানা/আপ্র/৩০/১০/২০২৬