মানুষ কেন কাঁদে-এই প্রশ্নটি উনিশ শতকে চার্লস ডারউইনের কাছে ছিল এক অমীমাংসিত ধাঁধা। তিনি মানুষের কান্নাকে কোনো নির্দিষ্ট বিবর্তনীয় উদ্দেশ্য ছাড়াই একটি জৈবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন। তবে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, কান্না মোটেও উদ্দেশ্যহীন নয়; বরং এটি একটি জটিল সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা, যা মানুষের টিকে থাকার প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বিজ্ঞানীদের মতে, কান্না এমন এক সংকেত যা সহজে নকল করা যায় না এবং যা অন্যের আচরণকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। এটি এক ধরনের বার্তা বহন করে-ব্যক্তি হুমকি নয়, তার সাহায্য প্রয়োজন এবং তিনি অপরের প্রতি আস্থাশীল।
গবেষণায় দেখা যায়, কান্নার বিবর্তন শুরু হয়েছিল শৈশবকালীন সংকট থেকে। ক্ষুধা, শীত বা ভয়জনিত পরিস্থিতিতে শিশুরা যে যন্ত্রণার আওয়াজ প্রকাশ করে, তা মূলত যত্নকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ ও সুরক্ষার উদ্দেশ্যে বিবর্তিত হয়। সময়ের সঙ্গে এই সংকেত শুধু শব্দে সীমাবদ্ধ না থেকে দৃশ্যমান উপাদান যেমন চোখের পানি, মুখভঙ্গি ও দেহভঙ্গি যুক্ত করে আরো শক্তিশালী সামাজিক বার্তায় রূপ নেয়।
মানুষের কান্না বর্তমানে একটি বহুমাত্রিক যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এতে শব্দ, দৃশ্য এবং রাসায়নিক সংকেত একসঙ্গে কার্যকর হয়। গবেষণা বলছে, এটি সামাজিক আচরণ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে।
বিজ্ঞানীরা আরো জানিয়েছেন, চোখের পানি শুধু আবেগ প্রকাশ নয়, বরং সামাজিক আচরণ প্রভাবিত করার সক্ষমতাও রাখে। এটি অন্যদের মধ্যে সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে এবং আক্রমণাত্মক প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, কান্না দেখলে মানুষের মস্তিষ্কে সহমর্মিতাসংশ্লিষ্ট অংশ সক্রিয় হয়।
কান্না একই সঙ্গে আত্মসমর্পণ ও দ্বন্দ্ব প্রশমনের সংকেত হিসেবেও কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে এটি মুখোমুখি সংঘাত কমিয়ে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করে।
জৈবিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আবেগপ্রবণ চোখের পানিতে বিশেষ ধরনের রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা অন্য ধরনের চোখের পানিতে অনুপস্থিত। এসব উপাদান মানবদেহের অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থার ইঙ্গিত বহন করে এবং তা অন্যের আচরণেও প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কান্না একাধিক কাজ একসঙ্গে সম্পাদন করে-এটি যন্ত্রণার সংকেত, সহমর্মিতার বার্তা, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার মাধ্যম এবং রাসায়নিক যোগাযোগের অংশ। এই বহুমাত্রিক কার্যকারিতার কারণেই এটি বিবর্তনের ধারায় টিকে রয়েছে।
সব মিলিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, ডারউইনের ‘উদ্দেশ্যহীন’ ধারণার বিপরীতে কান্না আসলে মানবসমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনীয় যোগাযোগব্যবস্থা, যা মানুষের সামাজিক জীবনকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২০/৪/২০২৬