মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে নরওয়েভিত্তিক টেলিযোগাযোগ কোম্পানি টেলিনরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির পুলিশ। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে।
নরওয়ের জাতীয় অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও পুলিশ নিরাপত্তা সেবা গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, টেলিনরের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক তদন্ত চলছে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার অসলোতে প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তরে আদালতের অনুমোদন নিয়ে যৌথভাবে তল্লাশি চালানো হয়।
নরওয়ের পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ২০২২ সালের ২৫ মার্চ মিয়ানমারে টেলিনরের ব্যবসা বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় সহযোগী সংস্থা বারবার গ্রাহকদের পুরোনো যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্য বা ট্রাফিক ডেটা সামরিক সরকারের কাছে সরবরাহ করেছিল। ওই সময়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বেসামরিক জনগণের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন চালাচ্ছিল বলে তদন্তকারীরা উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, টেলিনরের মিয়ানমার ব্যবসা বিক্রির সময় নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা নজরদারি সরঞ্জাম হস্তান্তর করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। নরওয়ের পুলিশের নিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, এ ধরনের সরঞ্জাম বিক্রির জন্য দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
২০২২ সালের মার্চে মিয়ানমার থেকে পুরোপুরি ব্যবসা গুটিয়ে নেয় টেলিনর। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা তদন্তকারীদের পূর্ণ সহযোগিতা করছে এবং ঘটনার সব দিক পরিষ্কার করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। রয়টার্সকে দেওয়া বিবৃতিতে টেলিনর বলেছে, সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করলে তাদের কর্মীদের কারাদণ্ড, নির্যাতন এমনকি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে পড়তে হতো। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কর্মীদের জীবন রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তারা ওই পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে সুইডেনের একটি অলাভজনক সংস্থা টেলিনরের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, টেলিনর মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কল রেকর্ড ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল। এর ফলে অন্তত একজন অধিকারকর্মীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ওই তথ্য ভূমিকা রেখেছিল বলে মামলায় দাবি করা হয়।
টেলিনর অবশ্য বলেছে, সামরিক অভ্যুত্থান মিয়ানমারের জনগণের জন্য একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল এবং প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের সামনে বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত টেলিনরের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি এবং কোনো ব্যক্তিকে আলাদাভাবে তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়নি।
মিয়ানমার সরকারের একজন মুখপাত্রের মন্তব্য জানতে রয়টার্স যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অসলোতে অবস্থিত মিয়ানমার দূতাবাসেও মন্তব্য চেয়ে ই-মেইল করা হলেও তাৎক্ষণিক উত্তর পাওয়া যায়নি।
অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ ‘জাস্টিস ফর মিয়ানমার’-এর মুখপাত্র ইয়াদানার মং নরওয়ের পুলিশের তদন্ত শুরুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, মিয়ানমারে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে টেলিনরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে নরওয়ের পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত এখনো চলমান এবং এ পর্যায়ে টেলিনর বা এর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণিত হয়নি।
সানা/আপ্র/১৭/৯/২০২৬