ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত ডানপন্থী প্রার্থী ও দেশটির সিনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারোর যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো ভূমিকা ছিল না বলে দাবি করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে বোলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে তাঁকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই নিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুবিও এসব কথা বলেন। সেখানে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-২০-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক চলছিল।
রুবিও বলেন, ‘আমরা কোনো কিছুরই ব্যবস্থা করে দিইনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন-এ খবর আমরা পেয়েছিলাম। তাঁর আগে থেকেই ভিসা ছিল। প্রেসিডেন্ট তাঁকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।’
তিনি আরো বলেন, ব্রাজিল থেকে বোলসোনারোর দেশত্যাগের জন্য যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর কোনোটিতেই মার্কিন সরকার সরাসরি জড়িত ছিল না।
রুবিও জানান, আটলান্টায় ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরার সঙ্গে শুক্রবার ও শনিবার তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে। আগামী নভেম্বরে ফ্রান্সে অনুষ্ঠেয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আরেকটি বৈঠকেও ব্রাজিলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের আশ্রয়ের আশ্বাস, মানবিক বিবেচনায় প্রবেশ: বোলসোনারোর প্রতি প্রকাশ্য সহানুভূতি জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। শনিবার ফ্লোরিডায় নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ব্রাজিলে বোলসোনারোর সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করা হয়েছে। তিনি যত দিন ইচ্ছা যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারবেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মানবিক কারণে সাময়িক প্রবেশের বিশেষ অনুমতি বা মানবিক প্যারোলের আওতায় বোলসোনারোকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অনুমতির মেয়াদ সাধারণত এক বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বোলসোনারো গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মায়ামিতে পৌঁছান। এর আগের দিন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেওয়া হবে। তবে তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি এবং ব্রাজিল ছাড়ার আয়োজন এক বিষয় নয় বলে স্পষ্ট করেছেন রুবিও।
পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ অমান্য করে দেশত্যাগ: ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গত ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোটে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার কাছে পরাজিত হন ফ্লাভিও বোলসোনারো। নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং কারচুপির অভিযোগ করেন। তবে তাঁর অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
নির্বাচনের পরপরই দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েস বোলসোনারোকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন এবং তাঁর সাধারণ ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচারসংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত চলছিল। একই সঙ্গে আইনজীবী ও ব্যবসায়ী উইলের তোমাজের সঙ্গে তাঁর আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। উভয়েই কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশের পর বোলসোনারোর ব্রাজিলের ইস্যু করা পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছিল। তাঁর দেশত্যাগ ঠেকাতে অভিবাসন ব্যবস্থায় সতর্কতাও জারি করা হয়। কিন্তু এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে তিনি দেশ ছাড়েন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) তিনি সীমান্ত পেরিয়ে আর্জেন্টিনায় যান। সেখান থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হন। ব্রাজিলের অভিবাসন তল্লাশিচৌকি দিয়ে তাঁর দেশত্যাগের কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড পাওয়া যায়নি। এ কারণে কীভাবে তিনি দেশ ছাড়লেন, তা তদন্ত করছে পুলিশ।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোলসোনারোর যুক্তরাষ্ট্রযাত্রার জন্য ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের ব্যবস্থা করতে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক কৌশলবিদ জেসন মিলার সহায়তা করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রুবিও।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বোলসোনারো নিজেকে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার বলে দাবি করেছেন। নির্বাচনে পরাজয় মেনে না নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকেই ব্রাজিলের বিরোধী রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, বোলসোনারোর বাবা ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বোলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজয়ের পর ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দায়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। বাবা-ছেলের রাজনৈতিক বিরোধ এবং ফ্লাভিওর দেশত্যাগের ঘটনায় ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সানা/আপ্র/০১/১১/২০২৬