যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। এই পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে সরাসরি দায়ী করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। যুদ্ধের পক্ষে এত দিন সরব থাকা রিপাবলিকান নেতাদের কেউ কেউ এখন সংঘাতের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ট্রাম্প অবশ্য নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক দাবি করে বলেছেন, আবার সুযোগ পেলেও তিনি একই পদক্ষেপ নিতেন। ফলে নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর রিপাবলিকান শিবিরে যুদ্ধনীতি নিয়ে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দলের পরবর্তী নেতৃত্বের লড়াইও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে ভ্যান্স বলেন, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের মূল কারণ ইরান যুদ্ধ। তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্টও আগের রাতে এ কথা বলেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া অনেক ভোটার এবার ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলেও জানান তিনি। ভ্যান্সের দাবি, এসব ভোটারের প্রধান প্রত্যাশা ছিল ইরান যুদ্ধের অবসান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের নীতিতে পরিবর্তন আনা। যুদ্ধের কারণে আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মূল্য কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
অন্যদিকে, ট্রাম্প ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-কে বলেছেন, তিনি সঠিক কাজই করেছেন এবং আবার সুযোগ পেলেও একই সিদ্ধান্ত নিতেন। তাঁর যুক্তি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে সামরিক অভিযান প্রয়োজন ছিল। তবে নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে যুদ্ধের প্রভাব থাকার বিষয়টি তিনি একেবারে অস্বীকার করেননি। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে তাঁর প্রশাসনের বক্তব্যেও উঠে এসেছে।
যুদ্ধের সমালোচনায় সরব হয়েছেন দীর্ঘদিনের ইরানবিরোধী রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজও। নিজের পডকাস্টে তিনি বলেন, সংঘাতটি সংক্ষিপ্ত, চূড়ান্ত এবং দ্রুত শেষ হওয়া উচিত ছিল। অর্থাৎ যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে নয়, বরং এর দীর্ঘায়িত হওয়া ও পরিচালনা নিয়ে দলের একাংশের অসন্তোষ স্পষ্ট হচ্ছে। গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে খসড়া অস্ত্রবিরতি সমঝোতায় যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের প্রস্তাব ছিল। ক্রুজসহ রক্ষণশীল আইনপ্রণেতারা ওই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। ক্রুজের বক্তব্য, কোনো পরিস্থিতিতেই ইরানের শাসকদের হাতে বিপুল অর্থ তুলে দেওয়া উচিত নয়। শেষ পর্যন্ত ওই সমঝোতাও কার্যকর হয়নি।
দলের ভেতরে নেতৃত্বের হিসাব
ট্রাম্পের দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ চলায় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রিপাবলিকান পার্টির পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভ্যান্সকে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী এবং আগামী নির্বাচনের অন্যতম প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে ইরান যুদ্ধের দায় থেকে নিজেকে দূরে রাখার মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের হিসাবও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে বড় বিভক্তি তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানে সামরিক অভিযানের পক্ষে থাকা নেতারাও এখন যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, তাঁরা সরাসরি যুদ্ধের বিরোধিতা না করে এর পরিচালনা ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সমালোচনা করছেন।
যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার বিভাগের অধ্যাপক নাতাশা লিন্ডস্টেট বলেন, ভ্যান্স শুরু থেকেই ইরান যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না। তাঁকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে সংঘাত অবসানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল। এখন তিনি নির্বাচনী ফলাফলের রাজনৈতিক বার্তা বুঝতে পেরে ট্রাম্পের অবস্থান থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন। অন্য রিপাবলিকান নেতারাও বুঝতে পারছেন, ট্রাম্পের সব সিদ্ধান্ত নিঃশর্তভাবে সমর্থন করলে তাঁদের নিজেদের রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সাবেক রিপাবলিকান কর্মকর্তা জন ফিহেরির মতে, ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এ দৌড়ে ভ্যান্সের পাশাপাশি ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পেছনে শুধু ইরান যুদ্ধ নয়; জ্বালানির উচ্চমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা সংকট এবং প্রশাসনের দুর্নীতির অভিযোগও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা চাপ
কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতি ও সামরিক ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাচ্ছে। তবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই তারা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছে না; নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে। এই সময় পর্যন্ত রিপাবলিকানদের হাতেই আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেছেন, ইরান যুদ্ধ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তাঁর বক্তব্য, মার্কিন সংবিধান প্রণেতারা কংগ্রেসের হাতে জাতীয় বাজেটের নিয়ন্ত্রণ দিয়েছিলেন, যাতে জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট নিজের ইচ্ছামতো যুদ্ধ চালাতে না পারেন। ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রো খান্না এমন একটি প্রস্তাব আনার কথা জানিয়েছেন, যা পাস হলে ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও কংগ্রেস অর্থায়ন বন্ধের পথ অনুসরণ করেছিল।
জন ফিহেরির মতে, সামরিক বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের ঋণসীমা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে ডেমোক্র্যাটদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। পাশাপাশি কংগ্রেসের শুনানিতে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও পরিচালনা নিয়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদায়ী রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস বলেছেন, হেগসেথকে যুদ্ধের বিষয়ে জবাব দিতে হবে। ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসন ক্রো তাঁকে অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত বলেও সমালোচনা করেছেন।
অধ্যাপক মাসগ্রেভের আশঙ্কা, আগামী দিনে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যয়সীমা ও কংগ্রেসের বাজেটসংক্রান্ত বিধিনিষেধ মানার প্রশ্নে বড় সাংবিধানিক সংঘাত দেখা দিতে পারে। প্রশাসন যদি কংগ্রেসের আরোপ করা অর্থায়নসংক্রান্ত সীমা অগ্রাহ্য করে, তাহলে যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের গণ্ডি ছাড়িয়ে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হতে পারে।
শান্তি আলোচনা চললেও যুদ্ধের প্রস্তুতি বহাল
নির্বাচনে পরাজয়ের পরও ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা থেমে নেই। কাতারের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক আলোচনা চললেও পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রয়েছে। গত মঙ্গলবার, নির্বাচনের দিনও হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে বিমান হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। পেন্টাগন ওই হামলাকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বলে দাবি করেছে। এ ছাড়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন রয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নতুন হামলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানও সতর্ক করে জানিয়েছে, নতুন করে কোনো আগ্রাসন চালানো হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী জর্জিও ক্যাফিয়েরোর মতে, নির্বাচনী পরাজয়ের পরও ট্রাম্পের সামনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ ডেমোক্র্যাটরা ২০২৭ সালের জানুয়ারির আগে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে পাবে না। এই মধ্যবর্তী সময়ে ট্রাম্প তেহরানের ওপর আরো আগ্রাসী হামলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন তিনি।
এর পাশাপাশি কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, দুই পক্ষই এখনো আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জবাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছে তেহরান।
ক্যাফিয়েরোর সতর্কতা, শান্তি আলোচনায় দুই পক্ষ বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি না হলে দোহাভিত্তিক মধ্যস্থতা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁর মতে, কাতার কোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে পারলেও ইসরায়েল তা ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
তবে ভোটের রাতে ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর তাৎক্ষণিক কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। ফলে একদিকে যুদ্ধের রাজনৈতিক দায় এড়াতে রিপাবলিকান নেতাদের দূরত্ব তৈরি, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি ও শান্তি আলোচনার সমান্তরাল তৎপরতা - সব মিলিয়ে ইরান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ এখনো অনিশ্চিত।
সানা/আপ্র/৬/১১/২০২৬