বয়সের ব্যবধান থাকা সম্পর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে আধুনিক সমাজে এখনও এ ধরনের সম্পর্ক সব সময় সহজভাবে গ্রহণ করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে এসব সম্পর্ককে সাময়িক আবেগ কিংবা জীবনের ক্ষণস্থায়ী একটি পর্যায় হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশেও এমন সম্পর্কের ঘটনা নতুন নয়। এ ধরনের সম্পর্কে জড়িত নারী-পুরুষকে নিয়ে নানা নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়। তবে এসব সম্পর্ক ঘিরে লজ্জা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বোঝা মূলত নারীদেরই বেশি বহন করতে হয়।
অন্যদিকে, প্রচলিত ধারণার বাইরে থাকা সম্পর্কের প্রতি সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর দাবিও জোরালো হচ্ছে। কারণ, আদর্শ সম্পর্কের প্রচলিত ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
বয়সের ব্যবধান থাকা সম্পর্কে জড়ানোর আগে তিনটি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি।
১. বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, সম্পর্কের ক্ষেত্রে বংশবিস্তারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সন্তান জন্মদানের সক্ষমতার কারণে পুরুষেরা সাধারণত কম বয়সী নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন। অন্যদিকে, সন্তান লালন-পালনে আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দিতে সক্ষম পুরুষদের প্রতি নারীদের আগ্রহ থাকতে পারে।
২০১২ সালে ‘হিউম্যান নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, সন্তান জন্মদান ও গর্ভধারণের ক্ষেত্রে নারীদের শারীরিক বিনিয়োগ বেশি। এ কারণে তাঁরা সাধারণত স্থায়ী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্ক চান। এমন সঙ্গী খোঁজেন, যিনি ভবিষ্যৎ সন্তানের দায়িত্ব নিতে সক্ষম এবং আগ্রহী।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বয়সের ব্যবধান থাকা সম্পর্কে পুরুষ সঙ্গীর বয়স বেশি হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কম বয়সী নারীদের প্রজননক্ষমতা তুলনামূলক বেশি থাকে। অন্যদিকে, বেশি বয়সী পুরুষদের পরিবার চালানোর মতো সম্পদ বেশি থাকতে পারে।
১৯৪৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষেরা সাধারণত নিজের চেয়ে আড়াই বছর কম বয়সী সঙ্গী পছন্দ করেন। অন্যদিকে, নারীরা নিজের চেয়ে সাড়ে তিন বছর বেশি বয়সী সঙ্গী পছন্দ করেন। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
২. সঙ্গীর বয়সের ব্যবধান কতটা গ্রহণযোগ্য?
একজন মানুষ কেমন বয়সের সঙ্গী পছন্দ করেন, শুধু সেটি বিবেচনা করলেই হবে না। কোন বয়সের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষেরা নিজের চেয়ে প্রায় ১০ বছর কম এবং সাড়ে চার বছর বেশি বয়সী নারীর সঙ্গে সম্পর্ককে গ্রহণযোগ্য মনে করেন। অন্যদিকে, নারীরা নিজের চেয়ে আট বছর বেশি ও পাঁচ বছর কম বয়সী পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক মেনে নিতে পারেন।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে এ ধারণাও বদলায়। পুরুষেরা বয়স বাড়ার সঙ্গে আরও কম বয়সী নারীর সঙ্গে সম্পর্ককে গ্রহণযোগ্য মনে করেন। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে কম বয়সী পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও বেশি বয়সী পুরুষের ক্ষেত্রে তা কমে।
গবেষকদের মতে, নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের চেয়ে বেশি হওয়ায় বয়স বাড়ার সঙ্গে বেশি বয়সী পুরুষের প্রতি তাঁদের আগ্রহ কমতে পারে। যেমন, জার্মানিতে নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের চেয়ে প্রায় পাঁচ বছর বেশি।
৩. সম্পর্কের সুখ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
বয়সের ব্যবধান থাকা সম্পর্কে মানুষ কতটা সুখী থাকেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকলে যেকোনো সম্পর্কই সুখের হতে পারে। তবে গবেষণায় বয়সের ব্যবধান থাকা সম্পর্কের সুখ নিয়ে কিছু ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
‘জার্নাল অব পপুলেশন ইকোনমিকস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও পুরুষ উভয়েই বেশি বয়সী সঙ্গীর তুলনায় কম বয়সী সঙ্গীর সঙ্গে বেশি সুখী থাকেন। তবে এই সুখ দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
গবেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে বয়সের ব্যবধান থাকা দম্পতিদের দাম্পত্যসন্তুষ্টি কমে। একই বয়সী দম্পতিদের তুলনায় তাঁদের ক্ষেত্রে এই পতন বেশি। সম্পর্কের সংকট মোকাবিলায়ও তাঁরা তুলনামূলক কম সক্ষম হতে পারেন।
তবে অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা বয়সের ব্যবধান থাকা দম্পতিদের মধ্যে ঈর্ষা কম থাকে। তাঁদের ভালোবাসায় স্বার্থহীনতার প্রবণতাও বেশি দেখা যায়।
গবেষণায় বয়সের ব্যবধান থাকা সম্পর্কের পেছনে বিবর্তনীয় কারণের সমর্থন মিললেও এ ধরনের সম্পর্কে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া ও দায়িত্বশীলতা থাকলে এমন সম্পর্কও সুখী ও পরিপূর্ণ হতে পারে।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে
এসি/আপ্র/০৭/১১/২০২৬