গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

মেনু

মজুরি আন্দোলনে অশান্ত মিরপুর-গাজীপুর, গ্রেফতার ৪৯

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:৪৬ পিএম, ০১ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২২:৩৮ এএম ২০২৬
মজুরি আন্দোলনে অশান্ত মিরপুর-গাজীপুর, গ্রেফতার ৪৯
ছবি

মিরপুর-১১ মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় -ছবি সংগৃহীত

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে রোববার (১ নভেম্বর) উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চল। সকাল থেকে কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধের একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। এ ঘটনায় মিরপুরে ২৯ জন এবং গাজীপুরে ২০ জনসহ মোট ৪৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভার ও আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে ১০০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি মিরপুরের বিভিন্ন কারখানাতেও কাজ বন্ধ থাকে। শিল্প পুলিশের হিসাবে, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে মোট ২৭৭টি কারখানা এক দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে মিরপুরসহ চার শিল্পাঞ্চলে তিন শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণার তথ্য জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

রোববার সকাল থেকেই মিরপুরের ১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবরোধের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে প্রশিকা মোড়সহ বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা এতে যোগ দেন। এতে ওই এলাকার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় দুপুর ২টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এতে উত্তেজনা আরো বাড়ে। মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান দুপুরে ১১ জনকে গ্রেফতারের কথা জানান। পরে মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার আবু নাসের রিকাবদার আরো ১৭ জনকে আটকের তথ্য দেন। বিকেলে মিরপুর বিভাগ থেকে জানানো হয়, ওই এলাকায় মোট ২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন জানান, সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে বিক্ষোভ করছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

গাজীপুরেও সকাল থেকে কোনাবাড়ী, শফিপুর, পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক, হরিণহাটি ও কালিয়াকৈরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। উত্তেজিত শ্রমিকেরা সড়কে কাঠ ও বাঁশ ফেলে আগুন ধরিয়ে দেন। কয়েকটি যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের পাশাপাশি কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে থাকা পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। একটি গাড়িতেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

শিল্প পুলিশ-২ গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, কোনাবাড়ী থেকে কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ পর্যন্ত সড়কের পাশের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকেরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছেন। এতে কারখানা কর্তৃপক্ষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

শ্রমিকদের অবরোধে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় ছয় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দিলে যান চলাচল শুরু হয়। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, বিকেল ৩টার দিকে শ্রমিকেরা মহাসড়ক ছেড়ে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এদিকে বিকেলে সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা। পরে বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।

সাভার ও আশুলিয়ায় সকাল থেকেই কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শুরু করেন। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় আল-মুসলিম, টাউজার লাইন ও নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা প্রথমে কারখানার ভেতরে কাজ বন্ধ রাখেন। পরে তাঁরা বাইরে এসে সড়কে অবস্থান নেন। তাঁদের সঙ্গে আশপাশের অন্য কারখানার শ্রমিকেরাও যোগ দেন। দুপুরের দিকে নরসিংহপুর এলাকায় অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকদের অবস্থানকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও আন্দোলনের মুখে সাভার-আশুলিয়ার ১৭৭টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, ওই এলাকায় ১০০টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সোমবার কারখানাগুলো চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

শ্রমিকেরা জানান, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা বন্ধ এবং বিভিন্ন অজুহাতে ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে তাঁরা আন্দোলন করছেন। সাভার-আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানার অপারেটর রাজু আহমেদ বলেন, তাঁদের কারখানায় সহকারীদের বেতন আট থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা। অন্য কারখানায় হাজিরা বোনাস দেড় হাজার টাকা দেওয়া হলেও তাঁদের কারখানায় দেওয়া হয় মাত্র ৫০০ টাকা। ন্যায্য মজুরি ও ভাতার দাবিতেই তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শ্রমিকেরা তিনটি প্রধান দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন। এর মধ্যে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ অন্যতম। এ বিষয়ে রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। রোববার সকালে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। পরে দুপুর ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পোশাকশিল্পের শ্রমিক অসন্তোষ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।

এর ধারাবাহিকতায় সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের বৈঠক শুরু হয়। পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা এবং শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

এর আগে শনিবারও একই দাবিতে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। ওই দিন মিরপুর-১ নম্বরের মাজারসংলগ্ন বাজার ও মার্কেট এলাকায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে শাহ আলী থানাধীন হিমালয় গার্মেন্টসের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে হিমালয় গার্মেন্টস ও পাশের বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুর চালানো হয়। বিকেলে পল্লবী থানার কালশী আদর্শনগর এলাকার একটি পোশাক কারখানাতেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন শ্রমিকেরা।

শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিশ্চিতের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ঘিরে শিল্পাঞ্চলগুলোর অস্থিরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি - সব মিলিয়ে সংকটের দ্রুত সমাধান জরুরি হয়ে উঠেছে।
সানা/আপ্র/০১/১১/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

সামিটের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ চার দিন, কমবে গ্যাসের চাপ
০১ নভেম্বর ২০২৬

সামিটের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ চার দিন, কমবে গ্যাসের চাপ

কক্সবাজারের মহেশখালীতে সামিট গ্রুপের ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে জরুরি রক্ষণা...

ধানমন্ডিতে সাবেক রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী হত্যা মামলায় ছেলে কারাগারে
০১ নভেম্বর ২০২৬

ধানমন্ডিতে সাবেক রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী হত্যা মামলায় ছেলে কারাগারে

রাজধানীর ধানমন্ডিতে ফিলিপাইনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত প্রয়াত মুহাম্মদ আবুল কাশেমের স্ত্রী আফিয়া...

ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক পরিচয় কর্মজীবনে না আনার নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
০১ নভেম্বর ২০২৬

ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক পরিচয় কর্মজীবনে না আনার নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলেও কর্মজীবনে তার কোনো প্রভাব পড়তে দেওয়া যাবে না বলে নবীন পুলিশ ও...

নতুন বেতন পাওয়া শুরু সরকারি চাকরিজীবীদের
০১ নভেম্বর ২০২৬

নতুন বেতন পাওয়া শুরু সরকারি চাকরিজীবীদের

নবম জাতীয় বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন বেতন পেতে শুরু করেছেন সরকারি চাকর...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই