গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

মেনু

গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা

১০টি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ সম্ভব

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:৫১ পিএম, ০১ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২২:৫৫ এএম ২০২৬
১০টি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ সম্ভব
ছবি

বিশ্ব ষ্ট্রোক দিবসে গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) বাহাদুর আলি মিয়া, জাহিদ রায়হান ও মালিহা হাকিম -ছবি সংগৃহীত

সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে স্ট্রোকের ঝুঁকি ও এর পরিণতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান-অ্যালকোহল বর্জনসহ ১০টি বিষয় মেনে চললে প্রায় ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব। অথচ এসব ঝুঁকির অধিকাংশই বাংলাদেশে বিদ্যমান। একই সঙ্গে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা ও পুনর্বাসনের ব্যয়ও কমানো যায়।

বিশ্ব স্ট্রোক দিবস উপলক্ষে রোববার (১ নভেম্বর) ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এসব কথা বলেন। আকিজ মেডিপ্লেক্সের সহযোগিতায় বৈঠকটির আয়োজন করা হয়।

ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ১০টি স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা মেনে চললে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিষয়গুলো হলো- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ; ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার; সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটা; অতিরিক্ত ওজন কমানো; স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম খাবার খাওয়া; মানসিক চাপ এড়িয়ে চলা এবং হৃদ্রোগ থাকলে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া।

অধ্যাপক শহীদুল্লাহ বলেন, এই ঝুঁকিগুলোর অধিকাংশই বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে রয়েছে। ফাস্ট ফুড ও জাঙ্ক ফুড খাওয়ার অভ্যাসের কারণে অল্প বয়সীদের মধ্যেও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন জরুরি।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, সাধারণত চল্লিশ বছর বয়সের পর স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। তবে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও স্থূলতার কারণে তরুণদের মধ্যেও এ ঝুঁকি বাড়ছে। জাতীয় সমীক্ষার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবনযাপন পদ্ধতির কারণে দেশের প্রতি চারজনের একজনের স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

স্ট্রোক প্রতিরোধে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান এবং তামাক সেবন পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। যাঁদের পরিবারে স্ট্রোকের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের সহকারী অধ্যাপক মো. নূর উদ্দিন (রনি) বলেন, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক এক নয়। স্ট্রোক মস্তিষ্কের রোগ, আর হার্ট অ্যাটাক হয় হৃৎপিণ্ডে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেক রোগী স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথমে হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট বা সাধারণ হাসপাতালে চলে যান। এতে চিকিৎসা শুরুতে দেরি হতে পারে।

স্ট্রোকের ধরন ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তাকে ইসকেমিক স্ট্রোক এবং রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলা হয়। মোট স্ট্রোকের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইসকেমিক ধরনের। সাময়িকভাবে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে স্ট্রোকের মতো উপসর্গ দেখা দিলে তাকে ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক বলা হয়, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের পূর্বাভাস হতে পারে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজির অধ্যাপক মো. খাইরুল কবির বলেন, দেশে স্ট্রোকের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত কেন্দ্র ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। স্ট্রোকের রোগীকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা গেলে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব। অন্যথায় রোগী স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়লে পরিবারকে বড় ধরনের আর্থিক ও সামাজিক সংকটের মুখে পড়তে হয়। সরকারি হাসপাতালে থ্রম্বোলাইসিসের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসুবিধা বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের ভিজিটিং প্রফেসর অধ্যাপক মালিহা হাকিম বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে স্ট্রোকের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। তাই অঞ্চলভিত্তিক অন্তত একটি করে থ্রম্বোলাইসিস সেন্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমা চালু করা গেলে চিকিৎসার ব্যয় বহন সহজ হবে। পাশাপাশি স্ট্রোকের পর শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসনকেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

নারীদের স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রসঙ্গে মালিহা হাকিম বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, প্রি-এক্লাম্পসিয়া, এক্লাম্পসিয়া, মেনোপজ-পরবর্তী হরমোন চিকিৎসা, স্থূলতা ও বিপাকীয় জটিলতা নারীদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের মধ্যে অ্যালকোহল ও মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধেও সচেতনতা জরুরি। তিনি আরো বলেন, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের পার্থক্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। স্ট্রোকবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে উল্লেখ করে রোগীর স্বার্থে গবেষকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হান সরকারের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমে সবাইকে ই-হেলথ কার্ড দেওয়া হবে। কার্ডে রোগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে যুক্ত এই কার্ডের পাশাপাশি সঠিক রেফারেল ব্যবস্থা ও ই-টিকেটিং চালু হলে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. বাহাদুর আলী মিয়া বলেন, হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, শরীরের কোনো অংশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, মুখ বাঁকা হওয়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়া স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এসব উপসর্গ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নিতে হবে।

ইউনিকো হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট ইশতিয়াক আহমাদ বলেন, স্ট্রোকের রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি পৌঁছানোর পরপরই চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সরকারি উদ্যোগে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসতে হবে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের অধ্যাপক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, জেলা ও প্রান্তিক পর্যায়ে নিউরো চিকিৎসার বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান না থাকায় রোগীদের ঢাকামুখী হতে হচ্ছে। এতে জাতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত হাসপাতালটির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের অধ্যাপক শামীম রশীদ। আলোচনায় আরো অংশ নেন মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান মনিরা আক্তার মনি, স্কয়ার হসপিটালসের কনসালট্যান্ট মো. ওয়াহিদুর রহমান, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের সহযোগী অধ্যাপক ইমরান সরকার, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক শরীফ উদ্দীন খান, আকিজ মেডিপ্লেক্সের চিফ বিজনেস অফিসার আবু জাফর ইকবাল আহামেদ এবং আকিজ রিসোর্সের চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার মো. তৌফিক হাসান।
সানা/আপ্র/০১/১১/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গুতে আরো ৮ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯২৯
০১ নভেম্বর ২০২৬

ডেঙ্গুতে আরো ৮ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯২৯

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্...

হামে আরো দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩৫৩
০১ নভেম্বর ২০২৬

হামে আরো দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩৫৩

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে আরো এক হাজার ৩৫০ জন শিশু...

ডেঙ্গুতে একদিনে আরো ৩ জনের মৃত্যু, ভর্তি ১,২৬২
৩০ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গুতে একদিনে আরো ৩ জনের মৃত্যু, ভর্তি ১,২৬২

দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরো তিনজনের মৃত্যু হয়...

হামের উপসর্গে আরো দুই মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১,২৫১
৩০ অক্টোবর ২০২৬

হামের উপসর্গে আরো দুই মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১,২৫১

দেশে হামের সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো দুজন...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই