১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ দেশের অরক্ষিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ওই দিন সিপাহী-জনতা তাঁকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে দেশের নেতৃত্বের ভার তুলে দিয়েছিল। জিয়াউর রহমান নিজে ক্ষমতার মোহে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিপ্লব ঘটাননি; বরং জাতির প্রয়োজনে মানুষই তাঁকে নেতা বানিয়েছিল।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে শনিবার (৭ নভেম্বর) রাতে ঢাকা অফিসার্স ক্লাবে আয়োজিত আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর জনগণের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। একদলীয় শাসনের কারণে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। জাতির মধ্যে জমে উঠেছিল ক্ষোভ। এমন সংকটময় মুহূর্তে ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে সিপাহী-জনতা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে অরক্ষিত পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র, সমসাময়িক অর্থনীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংবিধানের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের জনগণকে এক সুতোয় গেঁথে জাতীয়তাবাদের শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও সর্বস্তরের মুক্তিকামী মানুষের চিরন্তন ও সার্বজনীন অর্জন। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশরা যেটিকে সিপাহী বিদ্রোহ বলেছিল, সেটি ছিল মূলত উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ। সেই বিপ্লব ব্যর্থ হলেও ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব ব্যর্থ হয়নি। সেদিনের বিপ্লব সফল না হলে বাংলাদেশ হয়তো দীর্ঘ সময়ের জন্য পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ত।
‘চব্বিশ সবার, কারও একার নয়’
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও মালিকানা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চব্বিশ কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের একক অর্জন নয়। এটি দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সবার সম্মিলিত বিজয়। যারা ‘চব্বিশ আমাদের’ বলে একক মালিকানা দাবি করছেন, তাঁদের রাজনীতি পরিণত হবে না।
তিনি বলেন, “এখন যারা নবীন রাজনীতিতে এসেছেন, তারা বলছেন চব্বিশ আমাদের। চব্বিশ আমাদের আমাদের করতে থাকলে, চব্বিশ কারও থাকবে না। জুলাই চেতনার মালিকানা দাবি করতে থাকলে নবীন বন্ধুরা নবীনই থেকে যাবেন।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এক দিনে আসেনি। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বহু মানুষের আত্মত্যাগ, রক্ত, গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই অর্জন এসেছে। “চব্বিশ সবার, এই চব্বিশ এক দিনে আসেনি। এই চব্বিশ আনতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বহু মায়ের কোল খালি হয়েছে। বহু স্ত্রী তার স্বামীকে হারিয়েছেন। ইলিয়াস এখনো ফিরে আসেননি। আমাদের মতো সৌভাগ্য অনেক বন্ধুর অর্জন হয়নি। যারা এখনো গুম হয়ে ফিরে আসেননি, তাদের পরিবার জানে চব্বিশ আসতে কত ত্যাগ, তিতিক্ষা, রক্ত আমাদের দিতে হয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, যারা নির্যাতিত হয়েছেন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাঁদের পরিবার ও সন্তানেরা জানেন এই অর্জনের জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। শুধু ৩৬ দিনের জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও মালিকানা দাবি করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। “শুধুমাত্র ৩৬ দিনের জুলাই যারা বলছেন, তাদের এই চেতনা, মালিকানা যদি দাবি করতে থাকেন, সেই নবীন বন্ধুদের রাজনীতি নবীনই থেকে যাবে, কখনো আর বড় হতে পারবে না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ
আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টার অভিযোগও করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্বাচন যত বেশি দেরি করা যায়, অন্তত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছা ছিল। বাকশালের চরিত্র যাদের শরীরে রয়েছে, তারা ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না - এটাই বাস্তব।
বিচারকদের অবসরের বয়স নিয়েও প্রশ্ন
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা সঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পরবর্তী সরকারগুলোর সময়ও এর সুবিধা বহাল থাকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অবসরের বয়স ৬৫ বছরে ফিরিয়ে আনলে একসঙ্গে অনেক বিচারক অবসরে চলে যাবেন। তাঁদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে তদন্ত না হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধান পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এভাবে পরিবর্তন আনা হলে বর্তমান বিচারকদের অনেকেই দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থেকে যেতে পারেন। উচ্চ আদালতে দাগি অপরাধীদের জামিন পাওয়ার বিষয়েও সমালোচনা করেন তিনি। বিচারকদের অবসরের বয়স ৬৫ বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব কেমন হবে, তা উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে জানতে চান।
জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী প্রশাসন পরিচালনার আহ্বান
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জনগণের সেবা এবং নির্বাচিত সরকারের ইশতেহার বাস্তবায়নে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাঁদের মৌলিক দায়িত্ব হলো বেআইনি আদেশ অমান্য করে নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নির্বাচনকালীন দায়িত্ব সম্পাদন করা।
নিজেকে জনপ্রশাসনের পরিবারের একজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিভিল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক অংশীদার ও প্রাক্তন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এই পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক চাপ, লোভ কিংবা ভীতির কারণে প্রশাসনের একাংশ ভোটারবিহীন ও রাতের ভোটের নির্বাচনে সহায়তা করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর চরম মূল্য দিতে হয়েছে প্রশাসনকে। ভবিষ্যতে যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা বা ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রশাসনকে ব্যবহার করা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
ডেপুটি কমিশনারদের দায়িত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, মাঠপর্যায়ে তাঁরা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তাই তাঁদের দায়িত্ব অপরিসীম। নিজেদের সব সময় পরিশীলিত রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পাঁচ বছর পর জনগণ যাদের ম্যান্ডেট দেবে, তাদের হাতেই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। কারণ পরিবর্তনই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।
অফিসার্স ক্লাব ঢাকার সভাপতি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও অফিসার্স ক্লাব ঢাকার সাধারণ সম্পাদক এ বি এম আব্দুস সাত্তার। স্বাগত বক্তব্য দেন ক্লাবের ট্রেজারার এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক। অনুষ্ঠানে সাবেক সচিব মো. মশিউর রহমানও বক্তব্য দেন।
সানা/আপ্র/৮/১১/২০২৬