গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

আমাদের সময়, আমাদের দায়

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:০৯ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২১:২১ এএম ২০২৬
আমাদের সময়, আমাদের দায়
ছবি

ছবি সংগৃহীত

শাকিল কবির

কখনো কখনো মনে হয়, আমরা শুধু একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি না, বরং একটি কঠিন সামাজিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললে ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও নানা ধরনের নির্যাতনের খবর চোখে পড়ে। নদী দখল, পাহাড় কাটা, বন উজাড় ও বায়ুদূষণের খবরও আমাদের প্রায় প্রতিদিনই দেখতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসে ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও শোক। তারপর কয়েক দিন পর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনোটিকে আড়াল করে দেয়। কষ্টের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় আমাদের স্মৃতি থেকে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে ধর্ষণের অভিযোগে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৯টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালে এমন মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫টি। অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (এএসকে) সংবাদভিত্তিক পর্যবেক্ষণেও ধর্ষণের বহু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। দুটি উৎসের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ভিন্ন, তাই সংখ্যাগুলো সরাসরি তুলনীয় নয়। তবে বাস্তবতাটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই; যৌন সহিংসতা এখনো আমাদের বড় সামাজিক সংকট।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আইন ও সালিশ কেন্দ্র (এএসকে) ৬৪১টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ৪০০ জন নারী এবং ২৪১ জন শিশু। একই সময়ে ধর্ষণের পর ৩৭ জন নারী নিহত এবং ধর্ষণচেষ্টার ১৫২টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

ছিনতাই ও ডাকাতির চিত্রও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশে ১ হাজার ৯৩৫টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি। ডাকাতির মামলা হয়েছে ৭০২টি, বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। একই বছরে চুরির মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৬৭২টি এবং অপহরণের মামলা ১ হাজার ১০১টি।

একজন মানুষ অফিস শেষে বাড়ি ফিরছেন। একজন শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পর বাসায় যাচ্ছেন। একজন ব্যবসায়ী দিনের উপার্জন নিয়ে ঘরে ফিরছেন। তাদের মনে যদি প্রশ্ন থাকে, রাস্তায় বের হয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন না- তাহলে সেই সমাজকে নিরাপদ সমাজ বলা খুবই কঠিন।

হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। পুলিশি তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৩ হাজার ৭৮৬টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫৪টি বেশি। একই বছরে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (এএসকে) অন্তত ১৯৭ জনের গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, সহিংসতার সঙ্গে আমরা যেন ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। একটি হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ হয়, শোক প্রকাশ হয়, কিছুদিন আলোচনা চলে। এরপর নতুন কোনো ঘটনা আগের ঘটনাটিকে আড়াল করে দেয়। একজন মানুষের জীবন কি আজ শুধু একটি সংবাদ- যার শোক নতুন কোনো ঘটনার ভিড়ে কয়েকদিনের মধ্যেই হারিয়ে যায়? এই সংকট শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবস্থারও প্রতিচ্ছবি।

আমরা কীভাবে সন্তানদের বড় করছি, তারা কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, কী পড়ছে, কী দেখছে এবং মানুষের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হচ্ছে, সেসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা যদি শুধু পরীক্ষার ফলাফল ও চাকরির প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে মানুষ হওয়ার শিক্ষা কে দেবে? সেইসঙ্গে মোবাইল ও প্রযুক্তির ব্যবহার কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের মনোজগতে কী প্রভাব বিস্তার করছে, তা নিয়ে উন্নত বিশ্বে ভাবনা শুরু হলেও আমরা একেবারেই উদাসীন।

আমাদের রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ নিয়েও ভাবতে হবে। ১৯৭১ বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার ভিত্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা এবং জাতীয় মুক্তির ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধান আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। অথচ বাস্তব জীবনে যখন মানুষ নিরাপত্তাহীনতা, অন্যায় ও বৈষম্যের মুখোমুখি হয়, তখন আমাদের সেই মূল্যবোধগুলো নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশের সংকট।

আমরা প্রতিদিন যে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছি, সেটি আমাদের হাতেই বিপন্ন। নদী দখল ও দূষণ, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, বায়ু ও শব্দদূষণ শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, স্বাস্থ্য ও কৃষিসহ অর্থনীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ওছঅরৎ-এর ২০২৫ সালের ডড়ৎষফ অরৎ ছঁধষরঃু জবঢ়ড়ৎঃ অনুযায়ী বাংলাদেশে বার্ষিক গড় চগ২.৫ ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৬ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশিকার ১৩ দশমিক ২ গুণ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি উন্নয়ন করছি, নাকি নিজেদের বসবাসের জায়গাটাকেই ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছি?

ভুটান আমাদের জন্য একটি ভিন্ন ধরনের উদাহরণ তৈরি করেছে। দেশটি প্রায় ৭০ শতাংশ বনভূমি ধরে রেখেছে এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে গুরুত্ব দেয়। তাদের জাতীয় পর্যটন নীতিতে প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে যরময াধষঁব, ষড়ি াড়ষঁসব পর্যটনের ধারণা অনুসরণ করা হয়। আমাদেরও ভাবতে হবে, পর্যটন কি শুধুই মানুষের সংখ্যা বাড়ানো, স্থাপনা তৈরি এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের নাম। কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেট কিংবা সুন্দরবন শুধু পর্যটনের জায়গা নয়। এগুলো আমাদের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ।

এসব সমস্যার সমাধান কী, কেমন করে এই অবক্ষয় হতে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি। প্রথমত, আইনের শাসনকে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা অন্য কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার, সাক্ষীর নিরাপত্তা, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং আদালতের রায় কার্যকর করা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কঠোর শাস্তির ঘোষণা যথেষ্ট নয়। অপরাধীর মনে আইনের ভয় তৈরি হয় তখনই, যখন সে জানে অপরাধ করলে তাকে অবশ্যই আইনের মুখোমুখি হতে হবে এবং বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাদের দায়িত্ব নতুন করে ভাবতে হবে। সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য প্রস্তুত করলেই হবে না। মানুষের প্রতি সম্মান, নারীর মর্যাদা, আত্মসংযম, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং আইন মেনে চলার শিক্ষা দিতে হবে। তৃতীয়ত, পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা শুরু হতে হবে ছোটবেলা থেকেই। একটি শিশু যদি শেখে নদী কেন গুরুত্বপূর্ণ, গাছ কেন প্রয়োজন, পাহাড় কেন রক্ষা করতে হবে, বর্জ্য কোথায় ফেলতে হয় এবং প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্ব কী, তাহলে বড় হয়ে তার আচরণেও সেই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটবে।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু প্রতিবাদ যেন শুধু একটি পোস্টে সীমাবদ্ধ না থাকে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অবস্থান, আইন মেনে চলা এবং নিজের আচরণে পরিবর্তন আনা জরুরি। দেশ শুধু একটি মানচিত্রের নাম নয়। দেশ মানে মানুষ, প্রকৃতি, ইতিহাস, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই? যে বাংলাদেশে একজন নারী নিরাপদে চলতে পারবেন, একটি শিশু ভয় ছাড়া বেড়ে উঠবে, একজন নাগরিক নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরবে, অপরাধীর পরিচয় বা প্রভাব নয়, আইনের শাসনই হবে শেষ কথা; মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের ভিত্তি হয়ে থাকবে; আর নদী, পাহাড়, বন ও বাতাস মানুষের লোভের কাছে পরাজিত হবে না। সেই বাংলাদেশ তৈরি করার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়। দায়িত্ব আমাদের সবার।

আজ আমরা যদি প্রশ্ন না করি, প্রতিবাদ না করি, নিজেদের আচরণ না বদলাই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা না ভাবি, তাহলে একদিন তারাই আমাদের কাছে প্রশ্ন করবে, যখন সবকিছু চোখের সামনে ঘটছিল, তখন তোমরা কী করেছিলে? ইতিহাসের পাতায় আমরাও সমানভাবে অপরাধী হয়ে থাকব।

লেখক: পরিবেশ ও উন্নয়ন কর্মী
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

তেলের দাম বৃদ্ধি : অর্থনীতির ঘরে কি আগুন লাগবে?
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তেলের দাম বৃদ্ধি : অর্থনীতির ঘরে কি আগুন লাগবে?

সাইফুল ইসলামতেলের দাম বাড়লে শুধু তেলের দামই বাড়ে- এমন সরল অর্থনীতি পৃথিবীতে কোথাও নেই। তেল এমন এক পণ...

অযোগ্যতার চেয়েও বিপজ্জনক আত্মঅজ্ঞতা
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অযোগ্যতার চেয়েও বিপজ্জনক আত্মঅজ্ঞতা

ড. খালিদুর রহমানএকজন মানুষ অযোগ্য হতে পারেন। জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিংবা নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুণাব...

বেতন বাড়ছে, এবার কাজের মানও বাড়ুক
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বেতন বাড়ছে, এবার কাজের মানও বাড়ুক

শফিক আর. ভূঁইয়াসরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। যথারীতি সিদ্ধান্তটি নিয়ে স...

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস ও আমাদের বোধোদয়
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস ও আমাদের বোধোদয়

ড. আব্দুল ওয়াদুদআন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস জাতিসংঘ ঘোষিত একটা দিবস- যা ২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্যভ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই