রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে সোমবার রাতে এ হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়নের নেতারা। হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ছিলেন বলে তাঁদের দাবি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে হামলা শুরু হয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে হামলাকারীরা পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় সিপিবির দুই নেতা-কর্মীকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। যুব ইউনিয়নের দুই কর্মী আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার রাতে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে ছেড়ে দেওয়ার পর তাঁকে নিয়ে ছাত্র ও যুব ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা আনন্দ মিছিল বের করেন। মিছিলটি সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে পল্টন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দেওয়া হয়। এ সময় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি স্লোগান নিয়ে আপত্তি তোলেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয় এবং পরে হামলার ঘটনা ঘটে।
সিপিবির নেতাদের অভিযোগ, হামলাকারীরা নিজেদের যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দিয়ে ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’ স্লোগান দেন। পরে তাঁরা লাঠিসোঁটা নিয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। পরিস্থিতির একপর্যায়ে সিপিবি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহীর শাহরিয়ার রাত সাড়ে ১০টার দিকে বলেন, তাঁদের কার্যালয়ে হামলা করা হয়েছে। হামলাকারীদের স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মী বলে শনাক্ত করার দাবি করে তিনি বলেন, পল্টন থানা বিএনপি বা সহযোগী সংগঠনের লোকজনও এতে থাকতে পারেন। হামলাকারীরা তাঁদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাদিকুর রহমান শামীম বলেন, হামলার পর তাঁরা ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তাঁদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতারা এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও ছিলেন। হামলাকারীরা ভবনের ভেতরে ঢুকতে না পারলেও বাইরে থেকে গেটে ধাক্কা দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হামলার পর সোমবার রাত ১১টার দিকে সিপিবি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের অবস্থান -ছবি সংগৃহীত
সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখার পরও তাঁদের ওপর হামলা হয়েছে। সরকারকে নিজের দলের লোকজনকে সামলানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের সামনে এসে কীভাবে হামলা চালানো হয়। হামলার পর সিপিবির সদস্য ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুল আলম হামলা, ভাঙচুর ও কাউকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দীপক শীলকে ছেড়ে দেওয়ার পর ১৫ থেকে ২০ জন পল্টন এলাকায় মিছিল বের করেন। ওই মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি অভিযোগ তোলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়। পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেন, সিপিবির কার্যালয়ে ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী বিক্ষোভ দেখাতে গেছেন, এমন কোনো ঘটনার বিষয়ে তাঁরা অবগত নন। এ ধরনের কোনো নির্দেশনাও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সিপিবির বক্তব্য
রাত সোয়া ১২টার দিকে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঘোষণা দিয়ে তাঁদের দলীয় কার্যালয়ে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীরা ওই চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এবারের হামলার মধ্য দিয়ে আগের ব্যর্থতার আক্রোশ মেটানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সিপিবির ভূমিকার কথা তুলে ধরে আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই কারফিউ ভেঙে তাঁরা ঢাকার রাজপথে মিছিল করেছিলেন এবং ২ আগস্ট দ্রোহযাত্রা করেছিলেন। অথচ এখন তাঁদের ফ্যাসিস্ট ও পতিত সরকারের দোসর বলা হচ্ছে। যারা এসব বলছে, তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিপিবির কার্যালয়ে অতীতের হামলার ঘটনাও তুলে ধরেন দলটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, এরশাদের আমলে তাঁদের কার্যালয়ে হামলা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ৫ মে গানপাউডার দিয়ে কার্যালয়ের তিনতলা পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে ২৩ বছর তাঁদের দল নিষিদ্ধ ছিল এবং ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানও দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু কেউ তাঁদের দলকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হামলার কারণ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা দীপক শীলের মুক্তির পর একটি মিছিল হয়েছিল। সেখানে ‘জয় সমাজতন্ত্র’ ও ‘জয় সর্বহারা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। হামলাকারীরা স্লোগানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে হামলা করে থাকতে পারে। তবে কোনো স্লোগানই দলীয় কার্যালয়ে হামলার অজুহাত হতে পারে না।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। আওয়ামী লীগ এ স্লোগান দিয়ে অনেক অন্যায় করেছে বলে কমিউনিস্ট পার্টি স্লোগানটি ছেড়ে দেবে, এমন নয়। সিপিবির মিছিল থেকে কেউ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে থাকলেও তা দলীয় কার্যালয়ে হামলার অজুহাত হতে পারে না।
হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, তাঁরা নিজেদের একটি দলের লোক বলে পরিচয় দিয়েছেন, তবে সেই পরিচয় সত্য কি না, তা নিশ্চিত নয়। স্থানীয় সরকারদলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা হামলাকারীদের নিজেদের দলের লোক নন বলে জানিয়েছেন। হামলার বিষয়ে সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের পর সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানোর কথা বলেন তিনি।
দীপক শীলকে আটকের ঘটনা
সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে সোমবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে মীনা বাজারের সামনে মানববন্ধনের ডাক দেন সংস্কৃতিকর্মীরা। সেখানে জড়ো হলে পুলিশের বাধায় তাঁরা কর্মসূচি পালন করতে পারেননি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, মানববন্ধন চলাকালে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে পুলিশ ভ্যানে তুলে নেয়। পরে রাত ৯টার দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁর মুক্তির পর বের করা মিছিল থেকেই পল্টনে উত্তেজনার সূত্রপাত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সানা/আপ্র/২৭/১০/২০২৬