বিশেষ প্রতিনিধি: দেশে বর্ষাকাল শুরু হতে না হতেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল সময় ঘনিয়ে এলেও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম এখনও মূলত গতানুগতিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে প্রায় ৪ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু শেষ ১০ দিনেই প্রায় ৭০০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার প্রজনন দ্রুত বাড়ার কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পরিচালিত এক জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতে এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৮টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ২৮১টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা শনাক্ত হয়।
জরিপে দেখা গেছে, বহুতল ভবনে সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, স্বতন্ত্র বাড়িতে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সেমিপাকা বাড়িতে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে। এছাড়া মেঝেতে জমে থাকা পানিতে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, বালতিতে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং প্লাস্টিকের ড্রামে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ প্রজননক্ষেত্র শনাক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি।
মশা নিয়ন্ত্রণে গত এক দশকে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি। দুই সিটি কর্পোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত মশা নিয়ন্ত্রণে মোট ১ হাজার ১২ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ব্যয় করেছে ৬৮৮ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ব্যয় করেছে ৩২৩ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে উত্তর সিটিতে ১৮৭ দশমিক ৭৫ কোটি এবং দক্ষিণ সিটিতে ৫৩ দশমিক ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ড্রোনের মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, পরিত্যক্ত বর্জ্য সংগ্রহ, বাউল গানের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি, জলাশয়ে ব্যাঙ, হাঁস, তেলাপিয়া ও গাপ্পি মাছ অবমুক্তকরণসহ নানা অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চোখে পড়ে না। অনেক এলাকায় ফগিং কার্যক্রমও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। ফলে ডেঙ্গু নিয়ে জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ২৮টি ওয়ার্ডে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; নাগরিকদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ মশক নিধন কর্মসূচি চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংসে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বর্ষা মৌসুম এডিস মশার বংশবিস্তারের সবচেয়ে অনুকূল সময়। বিজ্ঞানভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। মশা দমন কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে কীটনাশকের ধরন ও ব্যবহারের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিলো মুহাম্মদ খান বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ন ও জৈবিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ছাড়া শুধু রাসায়নিক ফগিংয়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য সিটি কর্পোরেশনকে দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সতর্ক থাকতে হবে। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি করতে হবে। অন্যথায় চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সানা/আপ্র/১৫/৬/২০২৬