সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল হওয়া দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ-বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা এখন গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো এখনো উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হলেও তাদের সামনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন গবেষক শিতিজ বাজপেয়ী। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের জটিলতা, চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন-সব মিলিয়ে নতুন সরকারগুলোর জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক সংকট, আর্থসামাজিক চাপ ও অকার্যকর রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ থেকেই তিন দেশেই আন্দোলনের সূত্রপাত। শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও পণ্যসংকট এবং ঋণ পরিশোধের সংকট গণবিক্ষোভের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানে। আর নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধ, দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের সংকট তরুণদের আন্দোলনকে তীব্র করে তোলে।
তিন দেশেই ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ ওঠে। আন্দোলন সংগঠিত ও বিস্তারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পরবর্তী নির্বাচনে তিন দেশের রাজনৈতিক গতিপথ ভিন্ন রূপ নেয়। নেপালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা বালেন্দ্র শাহ। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী হন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতায় আসে জনতা বিমুক্তি পেরামুনার নেতৃত্বাধীন জোট এবং দেশটির নেতৃত্বে আসেন অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে।
তবে পরিবর্তনের আশা তৈরি হলেও নতুন সরকারগুলোকে ঘিরে শুরুতে যে উচ্ছ্বাস ছিল, তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষক। প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি, অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যর্থতা জনমনে হতাশা তৈরি করছে।
নেপালে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর তাঁদের পদত্যাগ করতে হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধন নীতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সহিংস অপরাধ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিতিজ বাজপেয়ীর মতে, বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন মোকাবিলা করতে না পারলে তিন দেশেই স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নেপালে জাতিগত ও আঞ্চলিক বিভাজন, শ্রীলঙ্কায় জাতিগত পুনর্মিলনের সংকট এবং বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দেশটির প্রধান রাজনৈতিক বিভাজন বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুপস্থিত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিহিংসার যে রাজনৈতিক চক্র দীর্ঘদিন ধরে চলেছে, তা ভাঙতে হলে কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে।’
বিশ্লেষণে আরো বলা হয়েছে, চলমান ইরান যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সম্ভাব্য রেশনিং ব্যবস্থা এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নতুন সরকারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন করে তুলছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলোও অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারত এসব দেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার। ফলে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এখন তিন সরকারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাম্প্রতিক বিজয় একদিকে গঙ্গা চুক্তি নবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে সীমান্তে কথিত পুশ ইন ও অভিবাসন ইস্যু নতুন উত্তেজনারও জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে নেপালের নতুন নেতৃত্ব এবং ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক দূরত্বও দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে চ্যাথাম হাউজের মূল্যায়ন হলো, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সরকারগুলো এখনো জনসমর্থন ধরে রাখলেও সেই সমর্থন টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের দ্রুত সংস্কার, সুশাসন এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুতই হতাশায় পরিণত হতে পারে।
সানা/আপ্র/১৫/৬/২০২৬