চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি থেকে চলচ্চিত্র শিল্প-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার চীনে এখন শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক নয়, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া নাকি তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা-এই প্রশ্নে দেশটিতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, চীনের উহান শহরে বাইডুর চালকবিহীন অ্যাপোলো গো রোবোট্যাক্সি সেবা চালুর পর বহু ট্যাক্সিচালকের আয় কমে গেছে। ৪৫ বছর বয়সী চালক ইয়াও সিননের ভাষ্য, ২০২২ সালে এই সেবা চালুর পর তার আয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। সম্প্রতি কারিগরি ত্রুটির কারণে রোবোট্যাক্সি বহরের কিছু গাড়ি সাময়িকভাবে সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ায় আবার কিছু যাত্রী তার ট্যাক্সিতে ফিরতে শুরু করেছেন।
মার্চে উহানের ব্যস্ত সড়কে অ্যাপোলো গো বহরের কয়েকটি গাড়ি হঠাৎ মাঝরাস্তায় বন্ধ হয়ে গেলে যানজট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সিস্টেমে গোলযোগের কারণে যাত্রীরা দীর্ঘ সময় আটকে পড়েন এবং তদন্তের জন্য গাড়িগুলো কয়েক মাসের জন্য প্রত্যাহার করা হয়।
চীন বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় অনেক বড় পরিসরে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তবে দেশটির শ্রমবাজার ইতোমধ্যেই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। উচ্চ বেকারত্বের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থায়ী চাকরি হারিয়ে অস্থায়ী বা খণ্ডকালীন কাজে ঝুঁকছেন। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে চীনে অস্থায়ী কর্মসংস্থানে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি; চলতি বছরে তা বেড়ে ৩২ কোটিতে পৌঁছাতে পারে, যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ।
এই বাস্তবতায় রোবোট্যাক্সির বিস্তার ট্যাক্সিচালকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালে উহানে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের খবরও পাওয়া যায়। একটি ট্যাক্সি কোম্পানি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিল, স্বয়ংক্রিয় গাড়ির নাটকীয় উত্থান প্রযুক্তিগত সম্পদকে কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি সাংহাইয়ে বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে এআইকে ‘যৌথ সমৃদ্ধি ও সার্বজনীন নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি’ হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেছেন। তবে একই সময়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ওয়ার্কার্স ডেইলি সম্পাদকীয়তে সতর্ক করে বলেছে, এআই যুগে কর্মসংস্থানের অধিকার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
চীনভিত্তিক প্রযুক্তি বিশ্লেষক সেলিনা সু মনে করেন, বেইজিংয়ের অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় এআই মডেল ডিপসিক-এর সাফল্যের পর সরকার পুরোপুরি এআই বিকাশের দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্দেশনাগুলোতে ‘মানুষকে অগ্রাধিকার’ দেওয়া এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চীনের কিছু আদালত ইতোমধ্যে এমন রায়ও দিয়েছেন, যেখানে দাপ্তরিক কর্মীদের এআই দিয়ে প্রতিস্থাপন করায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। তবে সাধারণ কর্মীদের বড় উদ্বেগ হলো-নতুন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেই এআই বড় বাধা হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন বেইজিংয়ের চিত্রগ্রাহক তিয়ান জেমিন। প্রায় দুই দশক চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করার পর তিনি এখন বেকার। তার দাবি, ২০১৯ সালের তুলনায় ফ্রিল্যান্স আয় প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। তার কথায়, “গত বছরও এআই অদ্ভুত চেহারার অবতার তৈরি করত, আর এখন প্রায় নিখুঁত ডিজিটাল ক্লোন বানিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করা সম্ভব।”
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তি খাতের ওপর সরকারের শক্ত নিয়ন্ত্রণ থাকায় চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এআইজনিত কর্মসংস্থান সংকট কিছুটা বেশি কার্যকরভাবে সামাল দিতে পারে। বেইজিং চাইলে কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নিয়োগে বাধ্য করতে পারে।
তবে প্রযুক্তির গতি এত দ্রুত যে অনেক কর্মীর আশঙ্কা-সরকারি সুরক্ষা পৌঁছানোর আগেই তারা প্রতিস্থাপিত হয়ে যেতে পারেন। তিয়ান জেমিনের ভাষায়, “হয়ত এখন আমাদের একমাত্র পথ হলো যত দ্রুত সম্ভব খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং এমন কাজ খুঁজে বের করা, যেখানে এখনও মানুষের সৃজনশীলতা পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়নি।” সূত্র: গার্ডিয়ান
সানা/ডিসি/আপ্র/২/৮/২০২৬