তিথী দেবনাথ
মেগাসিটি ঢাকার রঙিন ঝলমলে আলোর নিচে এক করুণ বাস্তবতা আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে প্রতিনিয়ত। এখানে প্রতিদিন কোটি মানুষ ছুটে চলে জীবিকার তাগিদে, গন্তব্যের উদ্দেশে। কিন্তু নাগরিক জীবনের এই ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপের মাঝে ওত পেতে থাকা এক অদৃশ্য আতঙ্কের নাম অরক্ষিত ম্যানহোল। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণÑ দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গলিপথ থেকে শুরু করে প্রধান মহাসড়কগুলোতে উন্মুক্ত হয়ে থাকা এই ম্যানহোলগুলো এখন খোদ রাজধানীর বুকে এক-একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
খবরের কাগজ কিংবা সামাজিক মাধ্যমের পাতায় হরহামেশাই নজরে পড়ে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার খবর। সামান্য অসাবধানতা, অসতর্কতা আর ফুটপাত বা রাস্তার ঢাকনাহীন গর্ত মুহূর্তেই কেড়ে নিচ্ছে একেকটি অমূল্য প্রাণ। বর্ষাকাল এলে এ আতঙ্ক যেন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। সামান্য বৃষ্টিতেই যখন ঢাকার রাজপথ নর্দমার হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়, তখন পথচারীদের জন্য বোঝা মুশকিল কোথায় মসৃণ রাস্তা আর কোথায় সেই মৃত্যুগহ্বর। শিক্ষার্থী, শিশু, বয়োবৃদ্ধ কিংবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য তা যেন একেকটি বিপজ্জনক যুদ্ধক্ষেত্র। দুর্ঘটনায় কেউ সারাজীবনের জন্য বরণ করছে পঙ্গুত্ব, আবার কেউ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে প্রিয়জনদের কাছ থেকে। এমনকি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে ছোট-বড় যানবাহনগুলোও। ম্যানহোল বা রাস্তার খাদে পড়ে যানমালের ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে চলেছে।
এখানে প্রশ্ন আসে, এর দায়ভার আসলে কার? ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, কিংবা ডিপিডিসির মতো সামাজিক সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাবই এখানে স্পষ্ট। নতুন রাস্তা তৈরি বা মেরামতের পর ম্যানহোলের ঢাকনা বসাতে মাসের পর মাস সময় চলে যায়। অনেক সময় স্থানীয় দুষ্কৃতকারীরা ঢাকনা চুরি করে নিয়ে যায়। আর সেই শূন্যস্থান পূরণে কর্তৃপক্ষের তৎপরতা চলে অত্যন্ত ধীরগতিতে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই সামাজিক সংস্থাগুলোর মধ্যে শুরু হয় কাদা ছোড়াছোড়ি ও পাল্টা দায় চাপানোর চেষ্টা। কিছুদিন বেশ আলোচনা-সমালোচনার পর পরিস্থিতি আবার যেমন ছিল তেমনই থেকে যায়, ঢাকনাহীন অবস্থায় পড়ে থাকে ম্যানহোলের গর্তগুলো।
একটি বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরীতে নাগরিকদের পথচলার ন্যূনতম নিরাপত্তা পাওয়া কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, তাদের অধিকার। কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর বড় বড় মেগাপ্রকল্প দিয়ে নগরীর মান বজায় রাখা যায় না- যদি না নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকুও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। ম্যানহোলের মতো একটি সাধারণ সমস্যা যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে এটি নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও উদাসীনতার নগ্নতার প্রমাণ। এই অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুফাঁদ থেকে রাজধানীকে মুক্ত করতে এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সিটি করপোরেশন ও ওয়াসাকে যৌথভাবে ঢাকার সব রাস্তার ওপর জরিপ চালিয়ে ভাঙা বা ঢাকনাহীন ম্যানহোলগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেগুলো সংস্কারের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বহুল প্রচলিত ভারী বা চুরির ঝুঁকি থাকা লোহার ঢাকনার পরিবর্তে অধিক টেকসই কম্পোজিট ফাইবার বা বিশেষ নকশার ঢাকনার ব্যবহার বাড়ানো দরকার। এ ছাড়া সেগুলোর স্থায়িত্বের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি। সাধারণ নাগরিকরা যেন রাস্তাঘাটে খোলা ম্যানহোল দেখামাত্রই তার ছবি তুলে দ্রুত ছবিসহ অবস্থান কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারে, এমন একটি কার্যকর অ্যাপ বা জরুরি হটলাইন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
ম্যানহোল উন্মুক্ত রাখার কারণে কোনো নাগরিক দুর্ঘটনায় পতিত বা প্রাণ হারালে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজধানী ঢাকাকে আমরা বিশ্বের বুকে এক নিরাপদ, গতিময় ও উন্নত নগরী হিসেবে দেখতে চাই। আর কোনো করুণ অকালমৃত্যু কিংবা পঙ্গুত্বের দঃসংবাদ আমাদের কারওই কাম্য নয়। কর্তৃপক্ষের দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সদিচ্ছা, দ্রুত পদক্ষেপ এবং দায়িত্বশীলতাই পারে ঢাকার রাজপথকে চলাচলের যোগ্য বা নিরাপদ করে তুলতে। পাশাপাশি রাজধানীবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি বদল একান্ত প্রয়োজন।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি ভাষা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০১.০৮.২০২৬