গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

হারিয়ে গেছেন জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা নারীরা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:২৩ পিএম, ১২ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২২:২৬ এএম ২০২৬
হারিয়ে গেছেন জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা নারীরা
ছবি

ছবি সংগৃহীত

জুলাই আন্দোলনের দিনগুলো আরও উত্তাল হয়ে উঠেছিল নারীদের নির্ভীক উপস্থিতিতে। পুলিশের জলকামান, টিয়ারগ্যাসের শেল আর লাঠিচার্জের মুখেও ব্যানার হাতে, আহতদের সেবায়, সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তায়, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলেন তারা।

অনেকের মতে, দেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে নারীর এত ব্যাপক সমাবেশ কমই দেখা গেছে। কিন্তু ওই আন্দোলনের দুই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পরিস্থিতি বদলে গেল। এখন অনেকের অভিযোগ, আন্দোলনে সামনের সারিতে দাঁড়ানো নারীকে পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব সারি থেকেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিকে ‘না’: জুলাই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক স্বর্ণা রিয়া সেই সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সংগঠিত করেছেন। ৫ আগস্টের পরও তিনি আন্দোলনের সঙ্গেই ছিলেন। সেসব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘জুলাই-পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র ধীরে ধীরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের মতামত নেওয়া হলেও তা সিদ্ধান্তে খুব একটা প্রতিফলিত হতো না।’ নিজ বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও নেতৃত্বের জায়গায় নারীকে সহজভাবে দেখে না বলে মনে করছেন লোক প্রশাসন বিভাগে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী স্বর্ণা রিয়া। এদিকে কারও অনুসারী হয়ে থাকতে চাননি বলে শেষমেশ রাজনীতি থেকেই সরে দাঁড়ালেন তিনি। তার ভাষ্যে, ‘জি হুজুর সংস্কৃতি ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারিনি।’ তবে সম্প্রতি পুলিশ হত্যা মামলায় ৩৫ নম্বর আসামি হওয়ার পর আবার ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষ্যে, জুলাইতে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হওয়ায় এখন নিজের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

নারীকে ডাকা হয় না: নারীদের অংশগ্রহণ আর নেতৃত্বকে এক করে দেখেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাইমা আক্তার রিতা। আর রাজনীতিতে নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার নাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আমাকে ডাকা হতো না। সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে শুধু জানিয়ে দেওয়া হতো।’ চাকরির প্রস্তুতি নিতে থাকা রিতার চোখে, ‘এই ঘটনা প্রমাণ করে নারীর উপস্থিতি থাকলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের প্রাধান্য নেই।’

রাজপথ ফেলে ব্যক্তিজীবনে ব্যস্ত: আন্দোলনে সামনে থাকা অনেক নারী পরে পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক বুলিংয়ের কারণে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারেননি। এই পর্যবেক্ষণ সমকালকে জানালেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক রূপন্তী রত্না। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পর নারীরা আবার পড়াশোনা, কর্মজীবন কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে গেছেন।’ নিজেও বর্তমানে পেশাগত পরিচয় গড়ে তুলতে পড়াশোনায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন বলে জানালেন মাস্টার্সের এই শিক্ষার্থী।

প্রয়োজন কি ফুরোল: আন্দোলনে সক্রিয় থাকা শারমিন সুলতানা নিশির অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত। সেই জুলাইতে হলের শিক্ষার্থীদের একত্র করায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি এখন রাখঢাক না রেখেই বললেন, ‘২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নানা আন্দোলনে দেখেছি, শুরুতে নারীদের লিফলেট বিতরণ, মিছিল কিংবা কর্মসূচিতে অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কিংবা ক্যামেরার সামনে কথা বলার পর্যায়ে এলেই তাদের পেছনে সরিয়ে দেওয়া হয়।’ উপমার ব্যঞ্জনে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষে ঢাল-তলোয়ার জাদুঘরে তুলে রাখা হয়। আন্দোলন শেষে নারীদের অবস্থাও এখন তেমন।’ ক্ষোভ নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করা সাবেক এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আন্দোলনের সময় নারী কী পোশাক পরছেন, কীভাবে রাজপথে দাঁড়াচ্ছেন সেসব নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। আন্দোলন শেষ হতেই তার পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক পরিচয়– সবকিছু নিয়েই বিচার শুরু হয়। বডি শেমিং, স্লাট শেমিং ও সাইবার বুলিংয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে নারীকে। পুরুষদের ক্ষেত্রে একই মাত্রার বিচার দেখা যায় না।’

কেন হারিয়ে গেল নারী নেতৃত্ব: নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতিতে বিশাল ঘাটতির পেছনে একাধিক কারণ দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর। তার ব্যাখ্যা হলো, ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক নারী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। আবার অনেকে কেবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই রাজপথে নেমেছিলেন। লক্ষ্য অর্জনের পর তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন। প্রতিবাদ করে পরে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ভাবনা সবার নেই।’

কেবল লক্ষ্য পূরণের ঢাল: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শ্যামলী শীল অবশ্য মনে করেন, ‘অনেক আন্দোলনেই নারীকে সামনে রাখা হয় এই ধারণা থেকে যে, তাদের ওপর হামলার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। নারীদের এক ধরনের ঢাল হিসেবেই ব্যবহার করা হয়।’ এই নারী অধ্যাপক বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এসে নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকের জায়গা থেকে নারীকে সরিয়ে দেয়।’ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে তিনি বলেন, ‘নারীর জন্য কেউ স্বেচ্ছায় নেতৃত্বের জায়গা ছেড়ে দেবে না। নিজের অধিকার ও নেতৃত্বের অবস্থান তাদেরই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

কেএমএএ/আপ্র/১২.৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শিশুর কাল্পনিক বন্ধু যেভাবে বিকাশে ভূমিকা রাখে
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশুর কাল্পনিক বন্ধু যেভাবে বিকাশে ভূমিকা রাখে

শিশুরা কখনো এমন কারো সঙ্গে কথা বলে, যাকে পরিবারের অন্য কেউ দেখতে পায় না। কখনো কাল্পনিক বন্ধুর জন্য খ...

শিশুদের নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
২১ অক্টোবর ২০২৬

শিশুদের নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

আজকের শিশুই আগামীর দেশ ও জাতির প্রকৃত সম্পদ। তারাই মূলত দেশ ও জাতি গঠনের কারিগর। একটি শিশুর জন্মের স...

নারীসত্তার পবিত্রতা ও সৃষ্টির শক্তি উপলব্ধির সাধনাই কুমারীপূজা
২১ অক্টোবর ২০২৬

নারীসত্তার পবিত্রতা ও সৃষ্টির শক্তি উপলব্ধির সাধনাই কুমারীপূজা

মাতৃভাব মানবহৃদয়ের অন্যতম পবিত্র অনুভূতি। এই ভাবের মধ্যেই নিহিত রয়েছে স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধা ও শুদ্ধতা...

ডিগ্রিধারী বৃদ্ধিতেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী কম
২১ অক্টোবর ২০২৬

ডিগ্রিধারী বৃদ্ধিতেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী কম

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬’ বাংলাদেশের উন্নয়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে