ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন মাহিরকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে দফায় দফায় নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৯ এপ্রিল মোবাইল ফোন কেনার কথা বলে মাহিরকে উত্তরার বোনের বাসা থেকে ডেকে নেন তাঁর বন্ধু ইয়াসিন আরাফাত। পরে তাঁকে বাড্ডার আফতাবনগরের একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাতভর কয়েক দফা মারধরের পর তাঁর মৃত্যু হয়। পরে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে হবিগঞ্জে ফেলে দেওয়া হয়।
২৩ বছর বয়সী মাহির ছিলেন চার বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। তিনি উত্তরার ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতেন।
এ ঘটনায় ২ মে মাহিরের বোন নার্গিছ খাতুন বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ইয়াসিন আরাফাত, রাকিবুল ইসলাম, রাকিবুলের স্ত্রী মোছা. অনন্যা, তানভীর হোসেনসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়। মামলার পর ইয়াসিন আরাফাত, মৃদুল সরকার ও জাহিদ মোল্লাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে আরাফাত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জাহিদ মোল্লার গাড়িতে করে মাহিরের লাশ সরানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক মো. হানিফ বলেন, মামলার তদন্ত চলছে এবং তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, পূর্ব শত্রুতা ও ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই এ ঘটনা ঘটেছে। রাকিবুলের স্ত্রীর করা একটি মামলায় মাহির সাক্ষী হওয়ায় তাঁকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ইয়াসিন আরাফাত পুলিশকে জানিয়েছেন যে তিনি, মাহির, অনন্যা ও রাকিবুলের ভাই রাজু উত্তরখান কলেজে একসঙ্গে পড়াশোনা করতেন। একসময় অনন্যার সঙ্গে মাহিরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে অনন্যাকে বিয়ে করেন রাকিবুল। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
আরাফাতের বর্ণনায় উঠে এসেছে, রাজুর অসুস্থতার পর মাহির নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর নিতেন। সেই সূত্রে রাকিবুলের পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। পরবর্তীতে রাকিবুলের প্রথম স্ত্রী সীমার সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় মাহির সাক্ষ্য দেন। ওই ঘটনাকেই হত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে আরাফাত জানান, পুরোনো একটি মোবাইল ফোন কেনার কথা বলে তিনি মাহিরকে আফতাবনগরের একটি বাসায় নিয়ে যান। সেখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে মাহিরকে আটকে ফেলা হয়। তাঁর হাত-পা বেঁধে মারধর শুরু করা হয়। লোহার রড দিয়ে পেটানোসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে তিনি গুরুতর আহত হন।
আরাফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক ব্যক্তি মাহিরের ওপর হামলায় অংশ নেন। রাতভর চলা নির্যাতনের শেষ দিকে মাহিরের শারীরিক অবস্থা গুরুতর অবনতি ঘটে। ভোরে তাঁকে পানি দেওয়া হলেও তিনি তা পান করতে পারেননি।
পরে মাহিরকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল সেখানে কয়েকজন প্রবেশ করেন। এরপর তাঁর মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে অন্যত্র যাওয়া হয় এবং কিছু অর্থ দিয়ে বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে আরাফাত বাসায় ফিরে যান।
পরদিন মাহিরের পরিবারের সদস্যরা তাঁর খোঁজে গেলে আরাফাত পুরো ঘটনা তাঁদের জানান। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধ তদন্ত বিভাগ আফতাবনগরের ওই বাসার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। সেখানে কয়েকজনকে কার্টনে মোড়ানো একটি বস্তা একটি কালো রঙের ব্যক্তিগত গাড়িতে তুলতে দেখা যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মাহিরের বোন নার্গিছ খাতুন বলেন, ঘটনার দিন সকালে মাহির তাঁকে জানিয়েছিলেন যে তিনি ইয়াসিন আরাফাতের সঙ্গে মোবাইল ফোন কিনতে যাচ্ছেন। পরে আর ফিরে আসেননি। তিনি দাবি করেন, রাকিবুলের পারিবারিক বিরোধসংক্রান্ত মামলায় সাক্ষ্য দেওয়াই তাঁর ভাইয়ের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল।
নার্গিছ খাতুনের অভিযোগ, প্রধান আসামি রাকিবুল এখনো গ্রেফতার হয়নি এবং তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মো. হানিফ বলেন, অভিযুক্তরা তাঁদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করছেন না। বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহারের কারণে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে তাঁদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রাকিবুলের বিরুদ্ধে অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও তুলেছেন মাহিরের বোন। তবে এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত এমন কোনো অভিযোগের নথিভুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ইয়াসিন আরাফাতের আইনজীবী হুমায়ন কবীর বলেন, মামলার বিস্তারিত তথ্য এখনো তাঁর জানা নেই। সম্প্রতি তিনি মামলাটির দায়িত্ব নিয়েছেন।
সানা/আপ্র/৬/৬/২০২৬