মাহাবুব রহমান বিপ্লব, বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি: রংপুরের বদরগঞ্জে পেশাদার সার ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে বিএনপি নেতা, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও বাড়ির কেয়ারটেকারের নামে সার ডিলারশিপ বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, পৌর বিএনপির সভাপতি এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের নাম ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজনদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ডিলার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুমোদিত সার ডিলারদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তালিকা প্রকাশের পর বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের পাশাপাশি পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও লেখালেখি শুরু হয়। গত দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
প্রকাশিত তালিকায় বদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার নয়টি প্রতিষ্ঠানকে সার ডিলারশিপ দেওয়ার তথ্য রয়েছে। তালিকা অনুযায়ী, রাধানগর ইউনিয়নে মেসার্স আদিব এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. খয়রাত হোসেন, মুন্সিপাড়া; গোপীনাথপুর ইউনিয়নে মেসার্স সরকার ট্রেডার্সের ফারুক আহমেদ সরকার, গোপীনাথপুর দক্ষিণপাড়া ডাঙ্গাপাড়া; রামনাথপুর ইউনিয়নে আয়ুস্মান ট্রেডার্সের গায়েত্রী রানী, ঘাটাবিল ব্রাহ্মণপাড়া; মধুপুর ইউনিয়নে মেসার্স মোকছেদুল ট্রেডার্সের মো. মোকছেদুল ইসলাম, রাজারামপুর নওয়াপাড়া।
এ ছাড়া কুতুবপুর ইউনিয়নে মেসার্স উষা ট্রেডার্সের শ্রী উত্তম কুমার সাহা, নাহগরহাট কুতুবপুর; কালুপাড়া ইউনিয়নে মেসার্স অরিন ট্রেডার্সের মোছা. সুমাইয়া শারমিন, সরকারপাড়া শংকরপুর; বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে মেসার্স হাছনা ট্রেডার্সের মোছা. হাছনা বানু, বুজুরুক হাজীপুর সরদারপাড়া; লোহানীপাড়া ইউনিয়নে মেসার্স সততা ট্রেডার্সের মো. আবু সুফিয়ান, সাদিয়াপাড়া লোহানীপাড়া এবং পৌরসভায় মেসার্স লোহানী এন্টারপ্রাইজের মো. সেলিম লোহানী কমল, মুন্সিপাড়া ডিলারশিপ পেয়েছেন।
তবে এসব ডিলারশিপ বরাদ্দে অনিয়ম ও দলীয় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো ইউনিয়নে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি তাঁদের বাড়ির কেয়ারটেকারের নামেও ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারাও ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সাইদুল হক বলেন, “বিগত সরকারের আমলে যারা প্রকাশ্য নৌকা মার্কার পক্ষে মিছিল-মিটিং করেছে, তারা কিভাবে সারের ডিলারশিপ পায়? এতে দলের ভাবমূর্তি আজ চরম হুমকির সম্মুখীন।”
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নিপুণও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে কালো টাকার বিনিময়ে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার পেছনে যারা জড়িত, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদেরকে দল থেকে অবিলম্বে বহিষ্কার করা উচিত।”
অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন সার ব্যবসায়ী বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছেন, প্রতিটি সরকারের আমলে পেশাদার সার ব্যবসায়ীরাই ডিলারশিপ পেয়ে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, এবার প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও তাঁদের স্বজনদের নামে ডিলারশিপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর কামরুজ্জামান নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “সার ডিলারশিপেও দলীয়করণ। মনে হচ্ছে স্বৈরশাসকের পথেই চলছে বর্তমান রাজনৈতিক চর্চা।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ না করায় তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তালিকা প্রকাশের পর থেকে বদরগঞ্জজুড়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে অস্বস্তি ও উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। তবে ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি কিংবা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সানা/আপ্র/১২/১০/২০২৬