রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে ‘স্বৈরাচার’ ও ‘গুপ্ত’রা অচিরেই এক হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্ভাব্য এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দলের সংসদ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ থাকার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর নির্দেশনা, স্থানীয় পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।
রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় এসব নির্দেশনা দেন তারেক রহমান। সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে শুরু হওয়া সভা চলে তিন ঘণ্টার বেশি সময়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে সভা শেষ হয়। এতে বিএনপির ১৯৪ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। অন্তত ২৫ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য সভায় বক্তব্য দেন।
ইতিবাচক ও পরিবর্তনশীল রাজনীতির তাগিদ
সভাপতির বক্তব্যে তারেক রহমান গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রেখে ইতিবাচক ও পরিবর্তনশীল রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বিএনপি হামলা-মামলা, জেল-জুলুমের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী দলকে ইতিবাচক ও পরিবর্তনশীল রাজনীতি চালিয়ে যেতে হবে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারকে অনেক বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে রীতিমতো জনতার জটলা বা ‘মব’ তৈরি করা হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংসদ সদস্যদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন।
দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ
আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, এবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। অতীতে হয়তো তাঁরা অন্য একটি দলকে ভোট দিতেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালনের পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বড় পরীক্ষা
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলের পাশাপাশি সরকারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে। তাই এখন থেকেই সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় কাজ শুরু করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে যিনি জনপ্রিয়, তাঁকেই প্রার্থী করতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দল-সমর্থিত প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে তাঁদের পাশে থাকার নির্দেশ দেন তিনি। কোনোভাবেই সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হতে দেওয়া যাবে না বলেও সতর্ক করেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
স্থানীয় বাস্তবতায় কর্মসূচি প্রণয়নের নির্দেশ
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়নের তাগিদ দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, গোপালগঞ্জের রাজনীতি এক রকম, বগুড়ার রাজনীতি আরেক রকম। তাই এলাকার চাহিদা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে কর্মসূচি নিতে হবে।
আগামী ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচিও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পালনের পরামর্শ দেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা, মাদক ও সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ
সভায় বক্তব্য দেওয়া সংসদ সদস্যরা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়া, মাদকের বিস্তার এবং গ্রেফতারের পর মাদক কারবারিদের দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তাঁরা সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম এবং ফ্যাসিবাদের দোসরদেরও ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ করেন।
এ সময় একজন সংসদ সদস্য অন্যের নির্বাচনী এলাকায় হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান। আরেকজন প্রতিমন্ত্রী চাকরিবাকরিসহ সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করেন।
সভায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
সভামঞ্চে সংসদ নেতা ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এক পাশে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম এবং অন্য পাশে আবদুল মঈন খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বসেন।
সানা/আপ্র/১২/১০/২০২৬