সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার টিকেট ও সুবর্ণাবাদ এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক কারবার, চুরি-ডাকাতি, জমি ও খাল দখল, চাঁদাবাজি, মৎস্য ঘের লুটপাট এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন টিকেট গ্রামের মৃত ফকির আহমদ মোল্লার ছেলে ইব্রাহিম মোল্লা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনে চায়ের ব্যবসার আড়ালে রাতে মাদক কারবার চলে। ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ও আদালতে প্রমাণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইব্রাহিম মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে চায়ের ব্যবসার পাশাপাশি স্থানীয় ও বহিরাগত কয়েকজনকে নিয়ে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে জমি ও খাল দখল, মৎস্য ঘেরের মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি, চাঁদা না পেলে ঘেরে বিষ প্রয়োগ, ঘের লুটপাট, বাড়িতে চুরি-ডাকাতি এবং নারীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, ইব্রাহিম মোল্লার স্ত্রী রাবেয়া খাতুনও নিজ বাড়ি, বিভিন্ন বাগান ও মৎস্য ঘেরের বাসায় খুচরা মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা হিন্দু সম্প্রদায়ের হওয়ায় এবং অভিযুক্তদের ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মৎস্য ঘের লুটপাট, গরু-ছাগল চুরি ও মাদক কারবারের সঙ্গে আবুল হোসেনের ছেলে আবদুল কাদের মোল্লা, ইব্রাহিম মোল্লা ও তাঁর স্ত্রী রাবেয়া খাতুন এবং মৃত খায়রুল শেখের ছেলে হারুন শেখ জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্থ জোগানের অভিযোগ ভাইয়ের বিরুদ্ধে
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ইব্রাহিম মোল্লার মাদক কারবারে অর্থ জোগান দেন তাঁর আপন ভাই আবদুল জলিল মোল্লা। তিনি ফরিদপুর শহরে কোচিং ব্যবসা করেন বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আবদুল জলিলের আত্মীয়স্বজন এবং তিনি তাঁদের দেখভাল করেন। তবে মাদক কারবারে তাঁর অর্থায়নের অভিযোগের পক্ষে কোনো আর্থিক নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোচিং ব্যবসার আড়াল ব্যবহার করে মাদক কারবার পরিচালিত হলে তা সহজে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিংকেন্দ্রের মতো জায়গাকে কোনোভাবেই অবৈধ ব্যবসার আড়াল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
অভিযোগ রয়েছে, সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকাকে মাদক পাচারের পথ হিসেবে ব্যবহার করে একটি চক্র বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশের অন্য উপজেলা ও জেলায় সরবরাহ করে। এভাবে মাদকের বিস্তার তরুণদের শিক্ষা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
তাঁদের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কখনো খুচরা মাদক বিক্রেতারা গ্রেফতার হলেও মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থ জোগানদাতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। একই সঙ্গে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। মাঝেমধ্যে অভিযানে ছোটখাটো চোর আটক হলেও চিহ্নিত চোর ও ডাকাতেরা অধরা থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ কারণে অনেক পরিবারকে রাতে নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়।
শামীম হত্যা মামলায় আসামিদের গ্রেফতারের দাবি
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দেবহাটায় শামীম হত্যা মামলায় ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দায়ের করা ৯ নম্বর মামলায় তিনজন আসামি গ্রেফতার হলেও অন্য আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে টিকেট গ্রামের মৃত ফকির মোল্লার ছেলে ইব্রাহিম মোল্লা, মৃত খায়রুল শেখের ছেলে হারুন শেখ এবং আবুল হোসেন মোল্লার ছেলে আবদুল কাদের মোল্লার নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ মাদক কারবার, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, জুয়া এবং মৎস্য ঘের লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে মামলার নথি ও পুলিশের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ইব্রাহিম মোল্লার বিরুদ্ধে দেবহাটা থানায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে টিকেট গ্রামের রেকসনা পারভীন তাঁর বিরুদ্ধে থানায় একটি অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে ইব্রাহিম মোল্লা, তাঁর স্ত্রী রাবেয়া খাতুন, মৃত খায়রুল শেখের স্ত্রী বাচা খাতুন এবং ছেলে হারুন শেখ সংঘবদ্ধভাবে প্রতিবেশী ছলেমান মিস্ত্রীকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ ও বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখান। একপর্যায়ে তাঁরা ছলেমান মিস্ত্রীর ওপর চড়াও হয়ে বাড়ির সামনের রাস্তায় মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোলা জখম হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
ছলেমান মিস্ত্রীর মেয়ে থানায় অভিযোগ করার পর ইব্রাহিম মোল্লার পক্ষ থেকে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় ছলেমান মিস্ত্রী ও তাঁর পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
নারী নির্যাতন ও অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, টিকেট এলাকায় অতীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের দাবি, কোনো সুন্দরী নারীকে লক্ষ্য করে ইব্রাহিম মোল্লার সহযোগীরা রাতে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মৎস্য ঘেরের বাসায় নিয়ে একাধিক নারীকে ধর্ষণ করেছেন। তবে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট মামলা, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য কিংবা অন্য স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আরো অভিযোগ, মদ্যপ অবস্থায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় মহড়া দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেন ইব্রাহিম মোল্লা ও তাঁর সহযোগীরা। তাঁরা এলাকায় একটি প্রভাবশালী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত বলে দাবি বাসিন্দাদের। প্রভাবশালী মহল, সাংবাদিক ও প্রশাসনের কিছু ব্যক্তির সঙ্গে সখ্যতার কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ধামাচাপা পড়ে যায় বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকার অনেক পুরুষ জীবিকার সন্ধানে বছরের প্রায় ছয় মাস বাড়ির বাইরে থাকেন। কেউ অন্য এলাকায় ইটভাটায় কাজ করেন, আবার কেউ শহরে ভ্যান চালান। ফলে অনেক নারীকে দীর্ঘ সময় বাড়িতে একা থাকতে হয়। তাঁদের অভিযোগ, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা নারীদের লক্ষ্যবস্তু করে। মাদক কারবার, চুরি-ডাকাতি ও নারী নির্যাতনের পেছনে প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হলেও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। থানায় অভিযোগ দায়েরের পরও সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হতো বলে দাবি তাঁদের।
দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবি
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা ইব্রাহিম মোল্লা, তাঁর সহযোগী এবং মাদক কারবারে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতার করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এলাকায় মাদক কারবার, চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন ও মৎস্য ঘের লুটপাটের অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইব্রাহিম মোল্লার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে আবদুল জলিল মোল্লার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের এসব অভিযোগের বিষয়ে দেবহাটা থানা পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
সানা/আপ্র/২৬/১০/২০২৬