মো: জাহাঙ্গীর আলম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: বয়স ৮০ বছর। তবু থেমে নেই জীবনের সংগ্রাম। ভোরের আলো ফুটতেই বাঁশ, হাতুড়ি, বাটাল ও দড়ি নিয়ে কাজে বসে পড়েন মকবুল হোসেন। তৈরি করেন দড়ির খাট। এরপর সেই খাট কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন হাটবাজারে। কোনো দিন বিক্রি ভালো হয়, কোনো দিন আশানুরূপ ক্রেতা মেলে না। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই। এই খাট বিক্রির আয়েই চলে তাঁর সংসারের খরচ।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ১ নম্বর বুলাকিপুর ইউনিয়নের শ্রীচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা মকবুল হোসেন। প্রায় ১০ বছর ধরে দড়ির খাট তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। বাঁশ, হাতুড়ি, বাটাল আর দড়িই এখন তাঁর বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে কখনো কাঁচা, কখনো পাকা রাস্তা ধরে বিভিন্ন হাটে পৌঁছান তিনি। রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করেন নিজের হাতে তৈরি খাট। ক্রেতার প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট-বড় খাট তৈরির চেষ্টা করেন। দীর্ঘদিন ধরে হাটে হাটে ঘোরার সুবাদে স্থানীয় মানুষের কাছেও পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি।
মকবুল হোসেন জানান, প্রতি হাটে সাধারণত একটি খাট বিক্রি হয়। প্রতিটির দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। তবে প্রতিদিন বিক্রি সমান হয় না। একটি দড়ির খাট তৈরি করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। এতে খরচ পড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে, তা দিয়েই সংসারের ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করেন তিনি।
মকবুল হোসেনের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বাড়িতে থাকা কিছু জমি চাষাবাদ করে পাওয়া অর্থ দিয়ে সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর সংসার। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা এবং পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে জীবনের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেছেন। এখন ৮০ বছর বয়সেও সংসারের খরচ জোগাতে তাঁকে হাটে হাটে ঘুরতে হয়।
রোদ-বৃষ্টি কিংবা শারীরিক ক্লান্তি- কোনো কিছুই তাঁকে সহজে থামাতে পারে না। কোনো দিন খাট বিক্রি করে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফেরেন, আবার কোনো দিন আশানুরূপ আয় না হওয়ায় হতাশ হতে হয়। তবু পরের দিনের জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নেন। কারণ, তাঁর কাছে কাজ বন্ধ রাখা মানেই সংসারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া।
মকবুল হোসেনের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নীরবে অবদান রেখে চলেছেন। নিজেদের শ্রম ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করছেন, পাশাপাশি পরিবার চালিয়ে নিচ্ছেন। তাঁদের জীবনসংগ্রামে যেমন রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, তেমনি রয়েছে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার প্রত্যয়।
মকবুল হোসেনের জীবন যেন গ্রামবাংলার অসংখ্য পরিশ্রমী মানুষের প্রতিচ্ছবি। হাটে হাটে ঘুরে খাট বিক্রি করাই তাঁর প্রতিদিনের জীবন। বড় কোনো স্বপ্ন নয়, পরিশ্রম করে পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটানো আর সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকাই তাঁর চাওয়া। তাঁর এই পথচলা কেবল জীবিকার গল্প নয়; এটি দায়িত্ব, শ্রম ও টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম।
সানা/আপ্র/০৪/১১/২০২৬