মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে সেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বণ্টনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পাঠানো চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তাঁর সই করা চিঠি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব এবং আইনমন্ত্রীর একান্ত সচিবকেও অবগত করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এক মামলার রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাঁদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই শহীদ পরিবার ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিলিবণ্টনের আদেশ দেওয়া হয়। ওই আদেশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশও দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, দ্রুত সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া না হলে দণ্ডিত পলাতক আসামিরা সেগুলো ভোগ, বিক্রি কিংবা অন্যভাবে হস্তান্তর করতে পারেন। এতে ট্রাইব্যুনালের বাজেয়াপ্তকরণসংক্রান্ত রায় ও আদেশ নিষ্ফল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে দুই আসামির সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
শেখ হাসিনার ঘোষিত সম্পদ: ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী হিসেবে জমা দেওয়া হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার সম্পদ দেখিয়েছিলেন।
হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর হাতে নগদ ছিল সাড়ে ২৮ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত ছিল। তিনটি মোটরগাড়ির মধ্যে একটি উপহার হিসেবে পাওয়া, যার দাম উল্লেখ করেননি তিনি। অন্য দুটি গাড়ির মূল্য দেখিয়েছিলেন সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা। সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর মূল্য দেখান ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং আসবাবের মূল্য ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
নিজের নামে ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমির কথা হলফনামায় উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। এর মধ্যে কেনা জমির অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয় ৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। এসব জমি টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, গাজীপুর ও রংপুরে।
গাজীপুর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে মৌচাকের তেলিরচালা এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের একটি বাগানবাড়ি রয়েছে। স্থানীয় ভূমি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে জমিটি লিখে দিয়েছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জমির মালিক হন। পরে তাঁরা জমির কিছু অংশ সন্তানদের লিখে দেন। এর সূত্রে শেখ হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ ও সায়মা ওয়াজেদ এবং শেখ রেহানার সন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকও মালিক হন। নথিতে জমির পরিমাণ ২৯৭ শতক বা ৯ বিঘা।
শেখ হাসিনার নামে ঢাকার পূর্বাচলে ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা মূল্যের একটি প্লটও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর নিজের নামে এবং ছেলে-মেয়ে, বোন শেখ রেহানা ও রেহানার দুই সন্তানের নামে পূর্বাচলে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে পরিবারের ছয় সদস্য ৬০ কাঠা জমি পান। ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে এসব প্লট বরাদ্দের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা চলছে।
হলফনামায় টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক জমির কথাও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। এর অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয় পাঁচ লাখ টাকা।
দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৫ সালের ২২ মে এক ব্রিফিংয়ে জানায়, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের জমির পরিমাণ ৬ দশমিক ৫০ একর দেখিয়েছিলেন। কেনার সময় এর মূল্য দেখানো হয়েছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। তবে যাচাই করে তাঁর নামে ২৮ একর ৪১ শতকের বেশি স্থাবর সম্পদ পাওয়া যায় বলে জানায় সংস্থাটি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠিও দিয়েছিল দুদক।
ভূমি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটির মালিকানা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের। আর শেখ হাসিনার বাসভবন ধানমন্ডির সুধা সদনের মালিকানা তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের নামে।
আসাদুজ্জামান খানের ঘোষিত সম্পদ: ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী হিসেবে জমা দেওয়া হলফনামায় আসাদুজ্জামান খান কামাল নিজের সম্পদের বিবরণ দিয়েছিলেন। তাতে হাতে নগদ ৮৪ লাখ টাকার কিছু বেশি এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮২ লাখ টাকা জমা থাকার কথা উল্লেখ করেন। বন্ড ও শেয়ারে ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা। ডাকঘর, সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ দেখান ২ কোটি ১ লাখ টাকা।
দুটি মোটরগাড়ির মূল্য দেখান ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও আসবাবের মূল্য ছিল ২ লাখ টাকা। ব্যবসার মূলধন হিসেবে ঋণ বাবদ ২ কোটি ২০ লাখ টাকা দেখিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ১০ ভরি সোনা থাকলেও এর মূল্য উল্লেখ করা হয়নি।
হলফনামা অনুযায়ী, আসাদুজ্জামান খানের কৃষিজমির পরিমাণ ১৭১ শতাংশ, যার অর্জনকালীন মূল্য ১ কোটি ৬ লাখ টাকা। অকৃষিজমি ছিল সাড়ে ১৮ শতাংশ, যার মূল্য সাড়ে ৫৮ লাখ টাকা। বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টের ঘরে দুটি সম্পদের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এর মধ্যে গ্রামের বাড়ির অর্জনকালীন মূল্য ৮০ লাখ টাকা এবং অন্য সম্পদের মূল্য প্রায় ১৩ লাখ টাকা।
১০ ভরি সোনার মূল্য বাদে তাঁর ঘোষিত সম্পদের মোট অর্থমূল্য প্রায় ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
আসাদুজ্জামান খানের সম্পদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান করছে। দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর জ্ঞাত আয়ের বাইরেও সম্পদ রয়েছে। এ বিষয়ে করা মামলায় আদালতে সংস্থাটি জানিয়েছে, অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকার সম্পদের মালিকানা অর্জন ও দখলে রেখেছেন তিনি।
সানা/আপ্র/০৪/১১/২০২৬