জুয়ার নেশার টাকা জোগাতে স্বজন ও বন্ধুদের ব্যক্তিগত পরিচয় চুরি করে যুক্তরাজ্যের সরকারি কল্যাণ তহবিল থেকে ১ লাখ ৭২ হাজার পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা, আত্মসাৎ করেছেন এক বাংলাদেশি যুবক। এ অপরাধে আতিকুর রহমান (৩৪) নামের ওই যুবককে ৪০ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ক্যান্টারবারি ক্রাউন কোর্ট এ রায় দেন।
আতিকুর কেন্টের মারগেট এলাকার বাসিন্দা। পেশায় তিনি একজন পণ্য সরবরাহকারী গাড়িচালক। কারাদণ্ডের পাশাপাশি আগামী আট বছর কোনো কোম্পানির পরিচালক হওয়ার ওপরও তার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে এ জালিয়াতি চালান আতিকুর। নিজের জুয়ার নেশার খরচ মেটাতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিবারের ২৬ সদস্যের ব্যক্তিগত নথিপত্র ও পরিচয় চুরি করেন তিনি। এসব পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি বিভিন্ন ভাতার জন্য ৪০টির বেশি আবেদন জমা দেন। এ ছাড়া করোনা মহামারির সময় সরকারি ব্যবসায়িক প্রণোদনা তহবিল থেকেও ৬২ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
শুনানিতে জানানো হয়, সরকারি অর্থ পেতে আতিকুর ভুয়া কোম্পানি, চাকরির জাল নথিপত্র এবং অস্তিত্বহীন সন্তানের তথ্য ব্যবহার করেন। স্বজন ও বন্ধুদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের সংবেদনশীল কাগজপত্র সংগ্রহ করতেন। পরে দেশটির কর্ম ও পেনশন বিভাগ এবং রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন ভাতার জন্য তাদের পরিচয়ে আবেদন করতেন।
জালিয়াতির মাধ্যমে তোলা অর্থের মধ্যে ছিল ইউনিভার্সাল ক্রেডিট, মাতৃত্বকালীন ভাতা, শিশু ভাতা ও কর্মজীবী কর রেয়াত। এসব অর্থ আতিকুর নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংক হিসাবে জমা করতেন এবং জুয়ার পেছনে ব্যয় করতেন। যাঁদের পরিচয় ব্যবহার করে ভাতা তোলা হচ্ছিল, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
২০১৮ সালে এক ভুক্তভোগী নিজে বৈধভাবে সরকারি ভাতার আবেদন করলে জালিয়াতির বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। কর্ম ও পেনশন বিভাগের কর্মকর্তারা তার জাতীয় বিমা নথিতে অসংগতি খুঁজে পেয়ে বিষয়টি বিশেষ তদন্তের জন্য পাঠান। পরে ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করে তদন্তকারীরা দেখতে পান, আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন একাধিক সরকারি ভাতার অর্থ সরাসরি আতিকুরের নিয়ন্ত্রণাধীন হিসাবে জমা হচ্ছে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় অর্থের চাহিদা বেড়ে গেলে আতিকুর সরকারি ব্যবসায়িক প্রণোদনা তহবিলের দিকে নজর দেন। তৎকালীন চ্যান্সেলর ঋষি সুনাক ঘোষিত ‘ইট আউট টু হেল্প আউট’ প্রকল্পের আওতায় ২০টি ভুয়া রেস্তোরাঁর নিবন্ধন জমা দেন তিনি। প্রকল্পটির আওতায় সোমবার থেকে বুধবার রেস্তোরাঁয় খাবারের ওপর সরকার ১০ পাউন্ড পর্যন্ত ভর্তুকি দিত।
ভুয়া রেস্তোরাঁ ও আতিথেয়তা ব্যবসার পরিচয়ে আবেদন করে সরকারি কোষাগার থেকে ৬২ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ নেওয়ার চেষ্টা করেন আতিকুর। তবে রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের স্বয়ংক্রিয় জালিয়াতি প্রতিরোধব্যবস্থায় আবেদনগুলো সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত হয়। ফলে অর্থ ছাড়ের আগেই সেগুলো আটকে দেওয়া সম্ভব হয়।
কর্ম ও পেনশন বিভাগের সঙ্গে যৌথ তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের অক্টোবরে মারগেটের বাসায় অভিযান চালিয়ে আতিকুরকে গ্রেফতার করে রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের জালিয়াতি তদন্ত শাখা। জিজ্ঞাসাবাদে ভুয়া রেস্তোরাঁ নিবন্ধনের কথা স্বীকার করেন তিনি। দীর্ঘ ফরেনসিক হিসাব নিরীক্ষার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার পাঁচটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। পরে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করেন আতিকুর।
রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের জালিয়াতি তদন্ত শাখার উপপরিচালক মার্গারেট মাউসলি বলেন, অর্থ ছাড়ের আগে যাচাই-বাছাইয়ের কারণে আতিকুরের জালিয়াতির চেষ্টা থেকে সরকারি কোষাগারের ৬০ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ রক্ষা পেয়েছে।
উদ্ভাবন, জালিয়াতি ও তথ্যবিষয়ক মন্ত্রী লিলিয়ান গ্রিনউড আতিকুরের কর্মকাণ্ডকে বিশ্বস্ত বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে ‘পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, অপরাধমূলক প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা প্রতিটি পাউন্ড জরুরি জনসেবা ও প্রকৃত প্রাপকদের ন্যায্য অর্থ থেকে বঞ্চিত করে। তার সরকার এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় জালিয়াতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে বলেও জানান তিনি।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৩১/১০/২০২৬