ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রীর ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আপত্তিকরভাবে বিকৃত করা, অশ্লীল বার্তা পাঠানো এবং ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একই শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করায় উল্টো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়েছে ১০ শিক্ষার্থী। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের ডিন হওয়ায় বিদ্যালয় প্রশাসন শুরু থেকেই পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার এবং ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে সকাল থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে তারা। তবে কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে আটকে রেখে দরজায় তালা দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তালা ভেঙে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা।
এ সময় তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- ‘হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’, ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই’ এবং ‘ওর বাবা ডিন হলে আমাদের বাবা কি রিকশাওয়ালা?’ এ ছাড়া বিভিন্ন স্লোগান দেয় তারা।
শিক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, ভুক্তভোগী ও প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের হয়রানি-হুমকি বন্ধ, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ডিনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ: বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে ছাত্রীরা জানিয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে সহপাঠী মেয়েদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করে আসছে। সম্প্রতি কয়েকজন ছাত্রীর আপত্তিকর ছবি তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ধর্ষণের হুমকি দেওয়ায় তারা আতঙ্কিত। এর আগে দুবার অভিযোগ জমা দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে তারা। অভিযোগ জানাতে গেলে তা গ্রহণ করা হয়নি বলেও দাবি ভুক্তভোগীদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী ছাত্রী জানায়, ওই শিক্ষার্থী চার বছর ধরে তাকে বিরক্ত করছে। একাধিকবার খারাপভাবে স্পর্শ করেছে এবং বন্ধুদের কাছে তার সংবেদনশীল অঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করেছে। শিক্ষকদের বিষয়টি জানাতে চাইলেও সাহস পায়নি সে। সম্প্রতি তার আপত্তিকর ছবি তৈরি করে বাইরের বিদ্যালয়গুলোতেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে প্রতিদিন বিভিন্ন মানুষের বার্তায় বিব্রত হতে হচ্ছে তাকে।
আরেক ছাত্রী জানায়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ নিয়ে অশালীন মন্তব্য ও বার্তা পাঠিয়ে বিব্রত করে। অনেক সহপাঠীকে ধর্ষণের হুমকিও দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলেও শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ জানানো কঠিন। আগেও এ বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
প্রতিবাদ করায় ১০ শিক্ষার্থীকে শাস্তি: বিক্ষোভকারী এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, অক্টোবরের প্রথম দিকে একদিন ক্লাস শেষে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিকৃত ছবি এবং সংশ্লিষ্ট বার্তা মুছে ফেলতে বলে তারা। এ সময় তাকে থাপ্পড় দিয়ে সতর্কও করা হয়।
শিক্ষার্থীরা জানায়, ৭ অক্টোবর অভিযুক্তের বাবা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন সহকারী প্রক্টর বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। পরদিন ৮ অক্টোবর পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষকেরা ১০ শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে একটি কক্ষে আটকে রাখেন। সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত তাদের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। অভিযোগের পক্ষে ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষিত একটি মুঠোফোনও কেড়ে নেওয়া হয় বলে দাবি তাদের।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযুক্তের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় প্রথমে তাদের পরীক্ষা ও ক্লাস থেকে বিরত রাখা হয়। অভিভাবকদের প্রতিবাদের মুখে পরে আলাদা কক্ষে পরীক্ষা নেওয়া হলেও শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পূজার ছুটিসহ মোট ২৫ দিন তারা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত ছিল। প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলে ছাড়পত্র দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। তদন্তের নামে অভিযুক্তকে অপহরণ ও গুরুতর মারধরের অভিযোগসংবলিত একটি কাগজে জোর করে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি শিক্ষার্থীদের।
তাদের আরো অভিযোগ, এক ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে অভিযুক্তের মা ও পরিবারের সদস্যরা ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। অন্য ভুক্তভোগীদের পরিবারকেও চাপ দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় বিদ্যালয় প্রশাসন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকারী প্রক্টর এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী ও এনামুল হক সজীবকে নিয়ে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, তদন্তের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে রাখা হয়েছে। তাদের শিখন ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করে দেওয়া হবে। তদন্ত কমিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনাস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি জেনেছেন এবং এ বিষয়ে আলোচনা করতে মঙ্গলবারই উপাচার্যের কাছে যাবেন।
অধ্যক্ষ আরো বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর কোনো আপত্তি থাকলে শিক্ষার্থীরা জানাতে পারবে। কোনো ধরনের অবিচার হতে দেওয়া হবে না এবং এখানে কারও হস্তক্ষেপের সুযোগও নেই। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো কোনো পরিবারকে এ ধরনের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জেনেছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হবে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও একটি অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। উল্টো তাঁর অভিযোগ, গত ৭ অক্টোবর কয়েকজন সহপাঠী তাঁর ছেলেকে বিদ্যালয় থেকে তুলে নিয়ে মারধর করেছে।
সানা/আপ্র/০৪/১১/২০২৬