একেএম ফজলুল হক: চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত এ নগরীর জনজীবন, পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে স্থবিরতা। গ্যাসের অভাবে শিল্প-কারখানার উৎপাদন কমেছে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষায় ভোগান্তিতে পড়ছেন চালকেরা। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং। অনেক আবাসিক এলাকায় দিনের বড় সময় চুলা জ্বলছে না।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সংকটের শুরুতে সরবরাহ নেমে আসে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। আগস্টের শুরু থেকে সরবরাহ আরো কমে যাওয়ায় আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক সব খাতেই সংকট তীব্র হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় চট্টগ্রামের বরাদ্দের একটি অংশ ঢাকার চাহিদা পূরণে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। গ্যাসের চাপ ও প্রবাহ কম থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভোরের পর থেকেই গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাচ্ছে। অনেক পরিবারে দুপুরের রান্না করতে হচ্ছে বিকেলে কিংবা রাত গভীরে। বাধ্য হয়ে অনেকে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
বাকলিয়ার বাসিন্দা ইশরাত জাহান বলেন, এক সপ্তাহ ধরে রান্নার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকালে গ্যাস চলে যাওয়ার পর দুপুরের খাবারও সময়মতো তৈরি করা যাচ্ছে না। এতে পরিবার নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকেরা। মইজ্জার টেক এলাকার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফরহাদ আলম বলেন, আগে ১০ থেকে ২০ মিনিটে গ্যাস পাওয়া গেলেও এখন চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় গ্যাস মিলছে না। এতে আয় কমে গিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিল্প খাতেও পড়েছে সংকটের বড় প্রভাব। কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ইস্পাত, টেক্সটাইল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকরাও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ করছেন।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটে শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, পণ্য সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয় সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানান তিনি।
সানা/আপ্র/৪/৮/২০২৬