গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

জনস্বাস্থ্যের নীরব বিপদ ‘সুপারবাগ’

প্রেসক্রিপশনে সংযম না এলে বিপদ অনিবার্য

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:১৩ পিএম, ০৬ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৬:৫৯ এএম ২০২৬
প্রেসক্রিপশনে সংযম না এলে বিপদ অনিবার্য
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ঢাকার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে যে নীরব বিপদ ছড়িয়ে পড়ছে, তা কেবল একটি হাসপাতাল-সংক্রান্ত সংক্রমণের গল্প নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক গভীর সংকেত। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে-‘ক্যানডিডা অরিস’ নামের ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক ঢাকার আইসিইউগুলোতে উদ্বেগজনক হারে বিস্তার লাভ করছে। গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে আইইডিসিআর-এর সহযোগিতা এবং যুক্তযাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর কারিগরি সহায়তায়। ফলে এর ফলাফলকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের শরীরে ক্যানডিডা অরিস পাওয়া গেছে এবং তাদের অনেকে হাসপাতালে থাকার সময়ই সংক্রমিত হয়েছেন। অর্থাৎ সংক্রমণ কেবল বাইরে থেকে আমদানি নয়; হাসপাতালের ভেতরেই এর বিস্তার ঘটছে। সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেশি-যা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতির দিকে সরাসরি আঙুল তোলে। প্রশ্ন হলো, আমাদের হাসপাতালগুলো কতটা প্রস্তুত? নিয়মিত জীবাণুনাশ, হাত ধোয়ার কঠোর অনুশীলন, স্ক্রিনিং ও নজরদারি-এসব কি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে?

ক্যানডিডা অরিসের ভয়াবহতা এখানেই যে, এটি বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। অর্থাৎ প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা আমাদের আরো বড় এক সংকটের দিকে নিয়ে যায়-অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর। অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল ব্যবহারের ফলে জীবাণুগুলো অভিযোজিত হয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, আর আমরা হারাচ্ছি কার্যকর চিকিৎসার অস্ত্র।

আমাদের দেশে সামান্য জ্বর, সর্দি বা কাশি হলেই অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রবণতা উদ্বেগজনক। ভাইরাসজনিত সাধারণ ঠান্ডা-কাশিতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো কার্যকারিতা নেই-তবু তা নেওয়া হচ্ছে। ফার্মেসি থেকে সহজলভ্যতা, প্রেসক্রিপশনে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা এবং রোগীর দ্রুত আরোগ্যের চাপ-সব মিলিয়ে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ‘সুপারবাগ’ আর ব্যতিক্রম থাকবে না; বরং নিয়মে পরিণত হবে।

এখন সময় কঠিন সিদ্ধান্তের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চিকিৎসকদের জন্য প্রমাণভিত্তিক গাইডলাইন বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আলাদা মনিটরিং সেল গঠন ও নিয়মিত অডিট চালু করা জরুরি।

একইসঙ্গে প্রয়োজন জনসচেতনতা। গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি পর্যায়ে প্রচারণা চালিয়ে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে-জ্বর বা ঠান্ডা-কাশি মানেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা হবে পরীক্ষাভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ নয়-এই বার্তাটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে হবে।

ভুলে গেলে চলবে না, অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় অর্জন। এই ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেলে ক্যানসারের চিকিৎসা, বড় অস্ত্রোপচার, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন-সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে। আজ যে শিশুটি আইসিইউতে, যে প্রবীণটি ভেন্টিলেশনে-তাদের জীবন রক্ষার জন্য কার্যকর ওষুধ প্রয়োজন। সেই ওষুধ যদি আমাদেরই অসচেতনতায় অকার্যকর হয়ে পড়ে, তার দায় কে নেবে?

‘সুপারবাগ’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে-সময় খুব বেশি নেই। প্রেসক্রিপশনে সংযম, ওষুধ বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে বিপদ অনিবার্য। এখনই নীতি ও প্রয়োগে কঠোরতা আনতে হবে।

জনস্বাস্থ্য কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও নাগরিক-সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার। অযাচিত অ্যান্টিবায়োটিক নয়, সচেতন চিকিৎসাই হোক আমাদের পথ। তাহলেই নীরব এই বিপদকে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সানা/আপ্র/৬/৩/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে