দেশের অর্থনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, আর বিনিয়োগের প্রবাহ উদ্বেগজনকভাবে নিম্নমুখী। এমন বাস্তবতায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে এই সংলাপ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এটিকে হতে হবে গভীর নীতিগত সংস্কারের সূচনা।
বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায়গুলো বহুদিন ধরেই আলোচিত-জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার, কর কাঠামোর জটিলতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং নীতির অস্থিরতা। ব্যবসায়ীরা আবারো সেই একই বাস্তবতার পুনরুল্লেখ করেছেন। এতে স্পষ্ট যে সমস্যার অভাব নেই, বরং অভাব কার্যকর ও ধারাবাহিক সমাধানের। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়া গেলেও, কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া বিনিয়োগে টেকসই গতি ফিরবে না।
সবচেয়ে বড় সংকট এখন আস্থার। বিনিয়োগকারীরা মূলত ভবিষ্যৎ দেখেই সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যখন নীতিমালা ঘনঘন পরিবর্তিত হয়, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার ঘাটতি থাকে, কিংবা পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়-তখন সেই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীর মধ্যেই এক ধরনের সতর্কতা, এমনকি অনীহা তৈরি হয়। এই আস্থার সংকট দূর না করলে কোনো প্রণোদনা বা সুবিধাই কাঙিক্ষত ফল দেবে না।
জ্বালানি খাতের দুর্বলতা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উৎপাদন ও শিল্প কার্যক্রমের মূল ভিত্তিই যখন অনিশ্চিত, তখন নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা ও ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাজারও দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীলতা হারিয়েছে, যা বিকল্প অর্থায়নের পথকে সংকুচিত করেছে।
সরকার যে ঋণনির্ভরতা থেকে সরে এসে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হতে চায়, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু এই রূপান্তর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট রূপরেখা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে, কীভাবে আসবে, কোন খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে-এসব প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দিতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজ, দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য করতে হবে।
বৈশ্বিক বাস্তবতাও এই মুহূর্তে বিনিয়োগের জন্য অনুকূল নয়। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই কম ঝুঁকির বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। তাই প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে নীতিগত স্থিতিশীলতা, আইনি সুরক্ষা এবং কার্যকর প্রশাসনিক সক্ষমতার মাধ্যমে নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
অন্যদিকে অবৈধ অর্থপ্রবাহ এবং অননুমোদিত বিনিয়োগের প্রবণতা অর্থনীতির জন্য নীরব হুমকি হয়ে উঠছে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে বিনিয়োগের যে সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, তা শুধু ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না; বরং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি ও সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
বর্তমান বাস্তবতায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান একে অপরের পরিপূরক। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কমে, আর কর্মসংস্থান না বাড়লে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগের হার হ্রাস এবং যুব বেকারত্বের ঊর্ধ্বগতি একটি সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে।
অতএব, এখন সময় আংশিক উদ্যোগ নয়, সমন্বিত ও সাহসী সিদ্ধান্তের। কর ব্যবস্থার সংস্কার, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা-এসব ক্ষেত্রেই দ্রুত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে চলমান সংলাপকে বাস্তব সংস্কারে রূপান্তর করতে হবে।
বিনিয়োগের প্রশ্নে এখন আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। আস্থা পুনর্গঠন এবং নীতিগত দৃঢ়তা প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই কেবল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় সম্ভাবনার এই দেশ ক্রমেই পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে-যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সানা/আপ্র/৬/৪/২০২৬