গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

সেবা দিতে গিয়ে জীবন বিপন্ন

কোথায় দাঁড়িয়ে দেশের স্বাস্থ্য প্রশাসন?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১১:৫২ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ০১:২৯ এএম ২০২৬
কোথায় দাঁড়িয়ে দেশের স্বাস্থ্য প্রশাসন?
ছবি

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গত মঙ্গলবার ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডা. শংকর প্রসাদ অধিকারীকে দেখতে যান - ফাইল ছবি

একটি দুর্ঘটনা আজ কেবল একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, এটি দেশের স্বাস্থ্য প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। মাঠপর্যায়ে সেবা দিতে গিয়ে যেভাবে একজন দায়িত্বশীল চিকিৎসক জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে গেছেন, তা পুরো ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনার খবর নয়, বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থার জমাট বাস্তবতা যা হঠাৎ করে দৃশ্যমান হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে দায়িত্ব পালনের নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন বহুদিন ধরে উপেক্ষিত ছিল, এই ঘটনা তাকে আবারো সামনে এনে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের স্তরে এখন তা পুনর্বিবেচনার দাবি তুলছে।

ঢাকার ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ডা. শংকর প্রসাদ অধিকারী। হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী অর্পিতা হালদার। এই নীরব অপেক্ষায় যেন এক পরিবারের ভাঙন, এক চিকিৎসা ব্যবস্থার গভীর সংকট আর দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার চিত্র একসাথে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গত ১২ এপ্রিল, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর প্রসাদ কমিউনিটি হাসপাতাল পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন। পথে হঠাৎ একটি গরু মোটরসাইকেলের সামনে চলে এলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। মুহূর্তের সেই দুর্ঘটনায় মাথায় ভয়াবহ আঘাত পান তিনি। বর্তমানে তিনি কোমায় আছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। চিকিৎসকদের ভাষায়, তাঁর মাথার খুলির হাড় ভেঙে গেছে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ চলছে এবং জ্ঞানস্তর অত্যন্ত নিম্ন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে খুলির একটি অংশ অপসারণ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গত মঙ্গলবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডা. শংকর প্রসাদ অধিকারীকে দেখতে যান

চিকিৎসকের দুই সন্তান-শাশ্বত শুদ্ধ অধিকারী (১৩) ও সৌরনীল অধিকারী (১১)-এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। বড় সন্তান বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়ায় পরিবারের উদ্বেগ আরো গভীর।

এই দুর্ঘটনার পর সামনে এসেছে আরেকটি বাস্তবতা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলা। পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি গাড়ি থাকলেও গত দেড় বছর ধরে তার জ্বালানি ও চালকের বেতন বন্ধ। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক চিকিৎসককে ব্যক্তিগতভাবে বা মোটরসাইকেলে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। অর্পিতা হালদারের অভিযোগ, আগে তাঁর স্বামী সরকারি গাড়িতে পরিদর্শনে যেতেন। কিন্তু ব্যয় বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সুবিধা আর নেই। ব্যক্তিগতভাবে ব্যয় বহন করা সম্ভব না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতই হয়ে উঠেছিল বাস্তবতা।

এই দুর্ঘটনা আরো এক প্রশ্ন সামনে এনেছে-সরকারি দায়িত্ব পালনের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের গাড়ির জ্বালানি ও চালক বাবদ অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ফলে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য তদারকি কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, যা গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোর দুর্বলতাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে জরুরি সমন্বিত ব্যবস্থা না থাকলে চিকিৎসা সেবার ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের জন্য বরাদ্দকৃত যানবাহনের জ্বালানি ও চালক সুবিধা বন্ধ থাকাই আজকের মর্মান্তিক পরিণতির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন পরিবার ও সহকর্মীরা। চিকিৎসকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত না হওয়ায় তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে এবং এটি সরাসরি জনসেবার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য তদারকি কার্যক্রম আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।

রাষ্ট্রীয় সেবা কাঠামোর এমন দুর্বলতা নতুন নয়। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য তদারকি কার্যক্রমে যেসব মৌলিক সহায়তা প্রয়োজন, তা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত। এতে একদিকে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, অন্যদিকে জনগণের স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। অতীতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ব্যবধানই আজকের সংকটকে গভীর করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সমন্বিত পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়া এই খাতে কাঙিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত চ্যালেঞ্জ। যা অবিলম্বে সমাধান প্রয়োজন।

এই দুর্ঘটনা শুধু একজন চিকিৎসকের নয়, একটি পরিবারেরও গভীর সংকট তৈরি করেছে। দুই শিশু সন্তান এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে কঠিন। রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী না হলে এ ধরনের পরিবারগুলো আরো গভীর সংকটে পড়বে। মানবিক সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া এখন জরুরি দায়িত্ব। এটি কেবল করুণা নয়, রাষ্ট্রীয় কর্তব্য। এবং তা অবিলম্বে নিশ্চিত করা উচিত।

একজন চিকিৎসকের জীবনসংকট তাই কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায় ও প্রশাসনিক উদাসীনতার প্রশ্ন। এখনই সময় স্বাস্থ্য প্রশাসনকে পুনর্গঠন করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার। নইলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এখন সময় এসেছে দায় নির্ধারণ নয়, কার্যকর সংস্কারের দিকে অগ্রসর হওয়ার। প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি এবং অবিলম্বে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন
১৯/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে