রাষ্ট্র পরিচালনার সূচনালগ্নের সময়সীমা সাধারণত দিকনির্দেশনা নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা হয়ে উঠেছে আস্থা পুনর্গঠন ও সক্ষমতার পরীক্ষার ক্ষেত্র। দুই মাসে সরকারের ঘোষিত বহুমুখী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে একটি সক্রিয় ও উদ্যোগী প্রশাসনের ইঙ্গিত দেয়। তবে বাস্তবতা হলো-রাষ্ট্র পরিচালনার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় ঘোষণার পরিমাণে নয়, বরং তার কার্যকারিতা, ধারাবাহিকতা এবং জনগণের জীবনে দৃশ্যমান প্রভাবের মাধ্যমে।
সরকার সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক সংস্কারসহ বিস্তৃত পরিসরে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পরিবারভিত্তিক সহায়তা, কৃষকদের জন্য বিশেষ সুবিধা, ঋণ মওকুফ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতি, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, শিক্ষা খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন-এসব পদক্ষেপ নীতিগতভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং দালালমুক্ত প্রক্রিয়া গড়ে তোলার উদ্যোগ সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে এই উদ্যোগগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-বাস্তবায়নের সক্ষমতা। অর্থনীতি এখনো বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত স্পষ্ট: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহে স্থিতি এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব অগ্রগতি। ঘোষিত কর্মসূচি যদি দ্রুত দৃশ্যমান ফল না দেয়, তাহলে আস্থার যে পুনরুদ্ধারের দাবি করা হচ্ছে, তা টেকসই নাও হতে পারে।
এখানে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান-স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। গণমাধ্যমকে যুক্তিসংগত সমালোচনার আহ্বান ইতিবাচক হলেও, তা কার্যকর হবে তখনই, যখন সমালোচনাকে নীতিনির্ধারণের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হবে। তথ্যপ্রবাহের উন্মুক্ততা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো উন্নয়নই স্থায়ী ভিত্তি পায় না।
অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ-এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল নীতি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণ কিংবা শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন বাস্তব ক্ষেত্রের জটিলতা দূর করা যাবে।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক সংস্কার ও সেবার ডিজিটাল রূপান্তর একটি ইতিবাচক দিক হলেও, এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক উদ্যোগই কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে শক্তিশালী নজরদারি, সময়সীমাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সবচেয়ে বড় বিষয়, জনগণের আস্থা অর্জন যেমন কঠিন, তা ধরে রাখা আরো কঠিন। আস্থা তখনই টেকসই হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন অনুভব করে। সেজন্য প্রয়োজন বাস্তবমুখী অগ্রাধিকার নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় প্রচার থেকে বিরত থাকা এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন।
অতএব, সরকারের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া নয়, বরং সেই পদক্ষেপকে টেকসই ও কার্যকর ফলাফলে রূপান্তর করা। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই কেবল এই উদ্যোগগুলো একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণে বাস্তব ভূমিকা রাখবে।
সানা/আপ্র/২০/৪/২০২৬