রাজধানীর মোহাম্মদপুর আজ এক গভীর অস্বস্তিকর বাস্তবতার প্রতীক-যেখানে সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের অনিবার্য অংশে পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এবং মাদকনির্ভর অপরাধ অর্থনীতির বিস্তার এই অঞ্চলকে কার্যত এক অঘোষিত সন্ত্রাস-নিয়ন্ত্রিত জনপদে রূপান্তর করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতিই নয়; এটি রাষ্ট্রের কার্যকারিতা, সামাজিক কাঠামো এবং নৈতিক ভিত্তির ওপর এক কঠিন প্রশ্ন।
মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন একটি সুসংগঠিত অপরাধ কাঠামো। এসব গোষ্ঠী আর বিচ্ছিন্ন বা স্বতঃস্ফূর্ত নয়; তারা নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত। আধিপত্য বিস্তারের নামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো দেখিয়ে দেয়-সহিংসতা এখানে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার ভাষায় পরিণত হয়েছে। এক গ্যাং দুর্বল হলে আরেকটি নতুন নামে আবির্ভূত হয়, ফলে অপরাধের এই চক্র ভাঙা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এই সহিংসতার কেন্দ্রে রয়েছে মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, যা কিশোরদের অপরাধে টেনে আনার প্রধান হাতিয়ার। সহজ অর্থ, দ্রুত প্রভাব এবং সামাজিক পরিচিতির মোহে তারা জড়িয়ে পড়ছে অন্ধকার জগতে, যেখানে মানবজীবনের মূল্য ক্রমেই অবজ্ঞাত। প্রকাশ্য রাস্তায় মাদক বেচাকেনা, এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ এবং প্রতিশোধপরায়ণতার ধারাবাহিকতা পুরো এলাকাকে চরম অনিরাপদ পরিবেশে ঠেলে দিয়েছে।
তবে এই সংকটের ব্যাখ্যা কেবল অপরাধীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন উঠছে-কেন ধারাবাহিক অভিযান, হাজারো গ্রেফতার এবং নিয়মিত টহল সত্ত্বেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটছে না? এর উত্তর নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতায়। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সহজে জামিনে মুক্তি এবং পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগের অভাব অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করছে। ফলে তারা বারবার একই অপরাধে ফিরে আসছে।
ভৌগোলিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঘন উপস্থিতি এবং নদীপথসহ সহজ পালানোর সুযোগ অপরাধীদের জন্য এক সুবিধাজনক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে দুর্বল করে তুলেছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
এখানে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সামাজিক নীরবতার প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। যখন অপরাধীরা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় থাকে, তখন আইন প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। আর ভুক্তভোগীরা ভয়ের কারণে মুখ না খুললে অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। এই নীরবতা শেষ পর্যন্ত সহিংসতাকে বৈধতার এক বিপজ্জনক আবরণ দেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো-এই সহিংসতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রজন্ম। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক নেতৃত্বের ব্যর্থতায় কিশোররা যখন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের জন্যও এক গভীর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই সংকটকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক বিপর্যয়।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের করণীয় স্পষ্ট এবং জরুরি। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, মাদক চক্রের শিকড় নির্মূল করা, কিশোরদের পুনর্বাসন ও কর্মমুখী সুযোগ সৃষ্টি এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন-এসব পদক্ষেপ একযোগে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সমাজকে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
পরিশেষে বলতে হয়-মোহাম্মদপুর আজ যে বার্তা দিচ্ছে, তা উপেক্ষা করা মানে একটি বৃহত্তর বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানানো। এই সংকট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কেবল একটি এলাকার নয়, বরং পুরো নগরসভ্যতার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
অতএব, কালক্ষেপণ না করে এখনই সময়-দৃঢ়, সমন্বিত এবং নৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নেওয়ার।
সানা/আপ্র/১৮/৪/২০২৬