গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে না পারলে থমকে যাবে জাতীয় উন্নয়ন

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:০৭ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ২০:৪৯ এএম ২০২৬
রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে না পারলে থমকে যাবে জাতীয় উন্নয়ন
ছবি

দেশের প্রধান কল-কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বড় বড় হাসপাতাল, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের প্রায় সবই ঢাকাকেন্দ্রিক -ছবি সংগৃহীত

ঢাকা আজ শুধু একটি শহর নয়-এটি যেন পুরো দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক জীবনের একক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই কেন্দ্রীভবনের ফলাফল এখন আর উন্নয়ন নয়, বরং এক গভীর কাঠামোগত সংকট। রাজধানীর ওপর ক্রমবর্ধমান জনচাপ, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং কর্মসংস্থানের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন এখন জাতীয় উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তবতা হলো-এই চাপ যদি কমানো না যায়, তবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াই একসময় থমকে যাবে।

গ্রাম থেকে শহরে মানুষের এই অবিরাম স্রোত কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত ভারসাম্যহীনতার ফল। কৃষি খাতে আয়ের সীমাবদ্ধতা, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের অভাব, মৌসুমি দুর্যোগ, নদীভাঙন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মানুষ বাধ্য হচ্ছে রাজধানীমুখী হতে। কিন্তু ঢাকায় এসে তারা যে জীবন খুঁজে পায়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা, ভাড়া বাসার সংকট এবং নিম্ন আয়ের অস্থির কর্মজীবন।

প্রতিদিন নতুন মানুষ ঢাকায় আসছে, পরিবারসহ স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ রিকশা চালাচ্ছে, কেউ দিনমজুরি করছে, কেউ ছোট ব্যবসায় টিকে থাকার লড়াই করছে। কিন্তু এই শহরের অবকাঠামো, আবাসন ব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবা এই বিপুল চাপ বহন করার মতো প্রস্তুত নয়। ফলে তৈরি হচ্ছে যানজট, বাসস্থানের সংকট, পরিবেশ দূষণ এবং সামাজিক চাপের এক জটিল চক্র।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো কর্মসংস্থানের চরম কেন্দ্রীভবন। দেশের প্রধান কল-কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বড় বড় হাসপাতাল, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের প্রায় সবই ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের সন্ধানে সারা দেশ থেকে মানুষ এখানে আসতে বাধ্য হচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল রাজধানীর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে না, বরং পুরো দেশের আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সুপরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ। শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভাগীয় শহরগুলোকে ঢাকার সমমানের নাগরিক সুবিধা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। সেখানে উন্নত হাসপাতাল, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে জেলা শহরগুলোতেও ধাপে ধাপে এই সুবিধা বিস্তৃত করা জরুরি। সেখান থেকেই আধুনিক মানসম্মত নগরায়ণ পেীঁছে যাবে উপজেলাগুলোতে। এভাবেই একদিন পুরো দেশটাই হয়ে উঠবে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের দৃষ্টান্ত।

শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে স্থাপন করা গেলে আঞ্চলিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। এতে শুধু কর্মসংস্থানই বাড়বে না, বরং ঢাকামুখী জনস্রোতও স্বাভাবিকভাবে কমে আসবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রমাণ করেছে যে বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া টেকসই নগর উন্নয়ন সম্ভব নয়। কেউ রাজধানীর ওপর চাপ কমিয়েছে প্রশাসনিক ক্ষমতা ছড়িয়ে দিয়ে, কেউ আবার নতুন নগর কেন্দ্র তৈরি করে জনসংখ্যার ভারসাম্য এনেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই পথ অনুসরণ করা ছাড়া বিকল্প নেই।

আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত স্পষ্ট-ঢাকা যত বড় হচ্ছে, সমস্যাও তত জটিল হচ্ছে। যানজটে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, পরিবেশের মান দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, আর জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই অবস্থাকে চলতে দেওয়া মানে ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে নিজের হাতে বাধাগ্রস্ত করা।

অতএব এখনই সময় সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ, আঞ্চলিক উন্নয়ন, এবং সমান সুযোগের অর্থনীতি গড়ে তুলতে না পারলে রাজধানীর ওপর চাপ আরো বাড়বে। আর সেই চাপ একসময় পুরো রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাঠামোকেই অচল করে দিতে পারে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর-উন্নয়ন কি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে সারা দেশে বিস্তৃত হবে। যদি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া না হয়, তবে জাতীয় উন্নয়নের গতি কেবল ধীর নয়, একসময় থেমেও যেতে পারে।
সানা/আপ্র/২৮/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে