গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

মধ্যবিত্তের নিঃশব্দ আর্তনাদ ও রাষ্ট্রের কঠিন দায়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:৫৪ পিএম, ০৯ মে ২০২৬ | আপডেট: ২২:৪৩ এএম ২০২৬
মধ্যবিত্তের নিঃশব্দ আর্তনাদ ও রাষ্ট্রের কঠিন দায়
ছবি

প্রতীকী ছবি

মূল্যস্ফীতি কেবল অর্থনৈতিক পরিভাষা নয়; এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের নির্মম বাস্তবতা। বাজারে পণ্যমূল্যের উর্ধ্বগতি সরাসরি আঘাত হানে সংসারের হাঁড়িতে, সন্তানের শিক্ষায়, চিকিৎসার ব্যয়ে এবং মানুষের ন্যূনতম মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারেও। আর এই আঘাত সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি-যারা সমাজের বৃহত্তম অংশ, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রায়ই সবচেয়ে উপেক্ষিত।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত এমন এক শ্রেণি, যারা দারিদ্র্যের কাতারে নাম লেখাতে লজ্জা পায়, আবার বিত্তশালীদের মতো নিরাপত্তাও তাদের নেই। তারা আয়-ব্যয়ের ব্যবধান গোপন রেখে সামাজিক মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু বাজার যখন অস্বাভাবিকভাবে চড়ে বসে, তখন এই শ্রেণির জীবনই প্রথম বিপর্যস্ত হয়। সীমিত আয়ের চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খায়। অনেক পরিবার বাধ্য হয় পুষ্টিকর খাদ্য কমাতে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিতে কিংবা সন্তানের শিক্ষাব্যয় সংকুচিত করতে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি আবারো বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষত খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই ব্যয় বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন ব্যয়, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে বাজারে প্রায় সব পণ্যের দাম উর্ধ্বমুখী হয়েছে। অথচ মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হওয়ায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ আগের চেয়ে বেশি আয় করলেও কম পণ্য কিনতে পারছে। এটি অর্থনীতির জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও অশনিসংকেত।

সরকারের উপলব্ধি করা জরুরি যে, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতারও বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাজারব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে সরকারের ওপর মানুষের আস্থা দ্রুত ক্ষয় হয়। অতীতে বিভিন্ন সরকারের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতির কারণেই বড় ধাক্কা খেয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়, প্রথমে নিজের সংসারের হিসাব বোঝে।

এখানে বৈশ্বিক বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কিংবা আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সংকট বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিকে চাপে ফেলবেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই অভিঘাত মোকাবিলায় রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত? বাজার তদারকিতে দুর্বলতা, অদক্ষ সরবরাহব্যবস্থা, অস্বচ্ছ আমদানি নীতি এবং সিন্ডিকেটনির্ভর বাণিজ্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। ফলে বৈশ্বিক সংকটের চেয়েও অনেক সময় অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনাই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়।

এখন প্রয়োজন কেবল সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল। জ্বালানি নীতিতে বাস্তববাদী সংস্কার, বাজার মনিটরিং জোরদার, সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরো কার্যকর ও বিস্তৃত করা জরুরি। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে বাজারের ভারসাম্য রক্ষা না করা গেলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কেবল কাগুজে পরিসংখ্যান হয়েই থাকবে।

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থার প্রথম শর্ত হলো সহনীয় বাজারব্যবস্থা। মানুষের রান্নাঘরে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে না পারলে কোনো উন্নয়নগাথাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
সানা/আপ্র/৯/৫/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে