গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

কাপাসিয়ার রক্তাক্ত বার্তা

নেশা, নৈতিক অবক্ষয় ও পারিবারিক ভাঙনের অন্ধকারে সমাজ

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১০:৫৫ পিএম, ১১ মে ২০২৬ | আপডেট: ২২:৪২ এএম ২০২৬
নেশা, নৈতিক অবক্ষয় ও পারিবারিক ভাঙনের অন্ধকারে সমাজ
ছবি

কাপাসিয়ার এক পরিবারে ৫ জন হত্যার শিকার ব্যক্তিকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে -ফাইল ছবি

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক পরিবারের পাঁচজনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত এক ভয়াবহ অস্থিরতার নগ্ন প্রকাশ। যখন একজন মানুষ নিজের স্ত্রী, সন্তান এবং নিকট আত্মীয়কে এমন নৃশংসতায় হত্যা করে, তখন প্রশ্ন জাগে-মানুষ কি নেশা গ্রহণ করে, নাকি নেশাই মানুষকে গ্রাস করে? এই প্রশ্ন আজ আর কেবল দার্শনিক নয়; এটি আমাদের সামাজিক বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

ফোরকান নামের ওই ব্যক্তি যখন নিজের পরিবারের পাঁচজনকে হত্যা করে স্বজনদের ফোনে জানায় “সব শেষ করে দিয়েছি”, তখন তার মানসিক অবস্থার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতা। এটি কি কেবল একজন বিকারগ্রস্ত মানুষের অপরাধ, নাকি একটি অসুস্থ সমাজের প্রতিফলন? যে সমাজে সভ্যতা ও মানবিকতা ক্ষয়ে গিয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরতার ছায়া ফিরে আসে, সেখানে এমন ঘটনা আর বিস্ময়কর থাকে না-বরং অনিবার্য হয়ে ওঠে।

এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পারিবারিক কলহ, সন্দেহ, পরকীয়ার অভিযোগ এবং মাদকসেবনের ইঙ্গিত-সব মিলিয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে মাদকাসক্তির বিষয়টি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন একজন ব্যক্তি নেশার প্রভাবে নিজের বিবেকবোধ হারিয়ে ফেলে, তখন সে আর মানুষ থাকে না; পরিণত হয় এক অমানবিক সত্তায়। ফলে সমাজে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক-আমরা কি মানুষকে বাঁচাচ্ছি, নাকি নেশার কাছে তাদের সমর্পণ করছি?

একই সঙ্গে পরকীয়ার বিষয়টিও আজ সামাজিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির অবারিত সুযোগে সামাজিক মাধ্যম এখন প্রায় প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতের মুঠোয়। এই মাধ্যম যেমন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নৈতিক বিচ্যুতির নতুন ক্ষেত্র। পরকীয়া-যা একসময় সীমিত পরিসরের বিচ্যুতি ছিল-আজ তা অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ভাঙনের প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। নারী ও পুরুষ উভয়ই এতে জড়িয়ে পড়ছেন, কিন্তু যাদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা, শিষ্টাচার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তারা এই অবক্ষয় থেকে নিজেদের বিরত রাখতে সক্ষম হন।

কাপাসিয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়-পারিবারিক কলহ কখনোই অবহেলার বিষয় নয়। একটি পরিবারের ভেতরে যখন দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব, সহিংসতা বা অবিশ্বাস জমতে থাকে, তখন তা যে কোনো সময় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়েই পারিবারিক সমস্যার সমাধান জরুরি। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের সক্রিয় ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না-মানুষে মানুষে সুসম্পর্ক ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। মানুষ দিন দিন যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে, সরাসরি মানবিক সম্পর্কের পরিবর্তে যন্ত্রনির্ভর যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ায় স্নেহ, ভালোবাসা ও মায়া-মমত্ববোধ হ্রাস পাচ্ছে। অথচ মানুষের প্রকৃত সুখ নিহিত আন্তরিক সম্পর্কেই। মানবিক বন্ধন সুদৃঢ় হলে মানুষ কখনো পাশবিক আচরণে লিপ্ত হয় না। তাই শৈশব থেকেই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই মূল্যবোধ গড়ে তোলা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সমাজে নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি আজ স্পষ্ট। শিক্ষা কেবল তথ্য অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন এই শিক্ষা থেকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও শৃঙ্খলা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন শিক্ষিত সমাজও অসভ্য আচরণের দিকে ধাবিত হয়। ফলাফল-কাপাসিয়ার মতো রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি।

অতএব, এই ঘটনার বিচার কেবল আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন সামাজিক পুনর্জাগরণ, মানুষে মানুষে সুসম্পর্ক ও মানবিক বন্ধন, নৈতিক শিক্ষার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মাদক ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। নইলে আজকের কাপাসিয়া আগামী দিনের অশনি সংকেত হয়ে আমাদের সামনে ফিরে আসবে-আর আমরা কেবল শোক প্রকাশ করা ছাড়া কিছুই করতে পারব না। 
সানা/আপ্র/১১/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে