গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনীতির সতর্কবার্তা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:২৭ পিএম, ০৬ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:৪৯ এএম ২০২৬
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনীতির সতর্কবার্তা
ছবি

ফাইল ছবি

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি সেবার মূল্য সমন্বয়ের ঘটনা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, জনজীবন এবং রাষ্ট্রীয় নীতির দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। যখন বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা-তিন স্তরেই একযোগে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হয়, তখন তার প্রভাব কোনো একটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে কৃষি, শিল্প, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবা খাত এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

সরকার বলছে, বিদ্যুৎ খাতে বিপুল ভর্তুকির চাপ, জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয় এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এই সিদ্ধান্ত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। বাস্তবতা হলো, মূল্যবৃদ্ধির পরও সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও সংকটের পুরো সমাধান হচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে-যে সিদ্ধান্ত জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, তা কি মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে?

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী। দেশের বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, চাকরিজীবী ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবার ইতোমধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপে বিপর্যস্ত। গত কয়েক বছরে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং জ্বালানি ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধিতে তাদের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সেই বাস্তবতায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। শুধু বিদ্যুৎ বিল নয়, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে। অর্থাৎ এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত মাশুল শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই দিতে হবে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সেইসব পরিবারের ওপর, যাদের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্য ও মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে। লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য পরে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া হলেও কৃষি সেচ, ক্ষুদ্র শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং উৎপাদন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি অনিবার্যভাবে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির অর্থ কেবল একটি বাড়তি বিল নয়; এটি জীবনযাত্রার ব্যয়ের একটি নতুন চক্রের সূচনা।

এখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সংস্কার, ভর্তুকি হ্রাস, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং আর্থিক শৃঙ্খলার নামে যে নীতিগত পরামর্শ বা শর্তগুলো সামনে আসছে, তার অনেকগুলোই বাস্তবে জনগণের ওপর প্রত্যক্ষ চাপ সৃষ্টি করছে। নিঃসন্দেহে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা জরুরি; কিন্তু সেই ভারসাম্য যদি বারবার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনমানের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনগণের ভোগান্তি বৃদ্ধি নয়।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বিপুল উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ অলস পড়ে থাকার পরও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অদক্ষতা, সিস্টেম লস, ব্যয়বহুল চুক্তি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার দায় সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত হতে পারে না। জনগণ যৌক্তিক মূল্য দিতে আপত্তি করে না; কিন্তু তারা জানতে চায়, নিজেদের ত্যাগের বিনিময়ে রাষ্ট্র কী ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন করছে।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি তাই কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি কঠিন বার্তাও। যদি রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, অপচয় রোধ, জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অযৌক্তিক ব্যয় হ্রাসের দৃশ্যমান উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে মূল্যবৃদ্ধির এই পথ বারবার ফিরে আসবে। আর প্রতিবারই তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সীমিত আয়ের মানুষকে।

রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সামাজিক ন্যায়বিচারও। অর্থনৈতিক সংস্কার তখনই সফল বলা যাবে, যখন তা কেবল হিসাবের খাতা নয়, মানুষের জীবনকেও স্বস্তি দেবে। বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সেই ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
সানা/আপ্র/৬/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে