টিকা সংকট, হাম রোগের বিস্তার এবং শিশুমৃত্যুর উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে নতুন করে কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দায়ের করা মামলার আবেদন আদালত খারিজ করলেও বিষয়টি জনপরিসরে নীতি, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্নকে আরো জোরালো করেছে। শিশুদের জীবন সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল ইস্যু কোনো অবস্থাতেই প্রশাসনিক বিতর্ক বা রাজনৈতিক তর্কে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।
আদালতের সিদ্ধান্তে মামলার আবেদন গ্রহণযোগ্য উপাদানের অভাবে খারিজ হয়েছে। তবে এটি জনস্বাস্থ্য সংকটের বাস্তবতা বা নীতিগত ত্রুটির অনুসন্ধানকে থামিয়ে দেয় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, টিকা সরবরাহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় কোথাও ঘাটতি ছিল কি না তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা। কারণ শিশুদের জন্য প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ, যার বিস্তার সাধারণত কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্পষ্ট হচ্ছে যে, প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কোথাও না কোথাও দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এটি কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয় নয়, বরং প্রশাসনিক সমন্বয়, পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতির প্রশ্নও বটে।
জনস্বাস্থ্য খাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ও পূর্বাভাসভিত্তিক পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব না দিলে সংকট আরো গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরেছে-শিশুর জীবন কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার কেন্দ্রবিন্দু। তাই দায় নির্ধারণের পাশাপাশি প্রয়োজন ভবিষ্যৎ সংকট প্রতিরোধে কার্যকর জাতীয় কৌশল গ্রহণ, যাতে আর কোনো শিশু প্রতিরোধযোগ্য কারণে প্রাণ না হারায়।
জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ফল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক শৈথিল্য ও নীতিগত অগ্রাধিকারহীনতার প্রতিফলন। টিকাদান কর্মসূচির মতো জীবনরক্ষাকারী উদ্যোগে কোনো ধরনের বিলম্ব বা সমন্বয়হীনতা সরাসরি শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। তাই স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ, সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় আনা জরুরি।
অবশ্যই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি শক্তিশালী করা ছাড়া এ ধরনের সংকটের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়। আদালতের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো যেমন জরুরি, তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতি ও ব্যবস্থাপনার কোনো ত্রুটি থাকলে তার স্বচ্ছ তদন্তও সমানভাবে প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রধান দায় শিশুদের জীবন সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কোনো ব্যক্তি, পদ বা মর্যাদা সেই দায়ের ঊর্ধ্বে নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু টিকাদান কর্মসূচিকে জাতীয় নিরাপত্তার সমান গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশু মৃত্যুর হার শুধু স্বাস্থ্য সূচক নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতারও প্রতিচ্ছবি। তাই যে কোনো নীতিগত পরিবর্তনের আগে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত।
এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং গুজব বা বিভ্রান্তি প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের অনাস্থা তৈরি না হয়। শিশুর জীবন রক্ষাই হওয়া উচিত সব নীতির কেন্দ্রবিন্দু।
অতএব, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রের নীতিগত অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জবাবদিহির কাঠামোর পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পেশাগত দক্ষতা এবং সর্বোপরি শিশুর জীবনের প্রতি সর্বোচ্চ সংবেদনশীলতা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নয়, বরং জনকল্যাণই হোক চূড়ান্ত মানদণ্ড। এই বাস্তবতা রাষ্ট্রকে সতর্ক করে যে-প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অবহেলার কোনো সুযোগই নেই।
সানা/আপ্র/১০/৬/২০২৬