জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক-কে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বিতর্ক দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি গভীর বাস্তবতাকে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগ-ব্যাংকটির ওপর নতুন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি ধর্মীয় নয়; এটি মালিকানা, শাসনব্যবস্থা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। দুই পক্ষের এই অবস্থান ভিন্ন হলেও একটি বিষয়ে উভয়ের বক্তব্যে পরোক্ষ মিল রয়েছে-ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন আস্থা নিজেই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কোনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, মুনাফা বা সম্পদের পরিমাণ যত বড়ই হোক না কেন, গ্রাহকের বিশ্বাস হারালে সেই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বিপুল সংখ্যক গ্রাহক, আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীর সঙ্গে এর সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। ফলে এ ব্যাংককে ঘিরে যেকোনো অনিশ্চয়তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; তা সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগের কারণ।
সংসদে উত্থাপিত অভিযোগে বলা হয়েছে, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং বর্তমানে একই ধরনের পরিস্থিতি আবারো সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিচালনা পর্ষদে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি, ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ এবং গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতার অভিযোগও সামনে এসেছে। অপরদিকে সরকারের পক্ষ থেকে শেয়ার মালিকানা, ঋণ বিতরণ, ব্যবস্থাপনা এবং অতীতের বিভিন্ন অনিয়মের তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, রাজনৈতিক পক্ষগুলোর নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কখনোই রাজনৈতিক শক্তির প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করতে পারে না। ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়, কোনো মতাদর্শের প্রতীকও নয়। একটি ব্যাংকের একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত তার আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, জবাবদিহি এবং গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা। ধর্মীয় আবেগ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা গোষ্ঠীগত আনুগত্যের আড়ালে ব্যাংকিং খাতের বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করার সুযোগ নেই।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শুধু নিরপেক্ষই নয়, দৃশ্যমানভাবেও নিরপেক্ষ থাকতে হবে। ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কাঠামো, পরিচালনা ব্যবস্থা, ঋণ বিতরণ এবং সাম্প্রতিক সব অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তের ফলাফল জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে, যাতে গুজব ও সন্দেহের অবসান ঘটে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন একটি জাতীয় অগ্রাধিকার। ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান বিতর্ক তাই কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। তাই রাজনৈতিক উত্তাপ নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত; অভিযোগের পাল্টা অভিযোগ নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত; দখলের সংস্কৃতি নয়, প্রয়োজন সুশাসনের সংস্কৃতি। কারণ ব্যাংক বাঁচলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বাঁচবে অর্থনীতির প্রতি মানুষের আস্থাও। সামগ্রিক অর্থে অর্থনীতি এবং জনসমাজ।
সানা/আপ্র/১১/৬/২০২৬