গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

মাইলস্টোন দুর্ঘটনার এক বছর============

শোকের চেয়ে বড় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার পরীক্ষা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:২৩ পিএম, ২২ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৭:০৪ এএম ২০২৬
শোকের চেয়ে বড় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার পরীক্ষা
ছবি

ফাইল ছবি

একটি জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সব সময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না; কখনো একটি দুর্ঘটনাই রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রশাসনের সক্ষমতাকে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনা তেমনই এক জাতীয় ট্র্যাজেডি। এক বছরে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি অসংখ্য স্বজনহারা পরিবারের অপেক্ষা, আহতদের দীর্ঘ চিকিৎসাযন্ত্রণা কিংবা জাতির উত্তরহীন প্রশ্ন। যেসব শিশুর প্রাণহীন দেহ বইখাতা আর শ্রেণিকক্ষের স্মৃতির সঙ্গে মিশে গেছে, তাদের হারানোর বেদনা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। এই শোক কেবল কয়েকটি পরিবারের নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রের নৈতিক দায়ের প্রতীক।

এক বছর পরও যখন তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না, তখন প্রশ্ন জাগে-রাষ্ট্র কী সত্য উদ্ঘাটনে যথেষ্ট আন্তরিক? একটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, দায় কার, কোথায় ত্রুটি ছিল এবং ভবিষ্যতে তা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-এসব জানার অধিকার শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নয়, প্রতিটি নাগরিকের। কারণ একটি দুর্ঘটনা গোপনীয়তার বিষয় হতে পারে, কিন্তু জননিরাপত্তা কখনোই গোপন রাখার বিষয় নয়। সত্য আড়াল করলে দায় মুছে যায় না; বরং অবিশ্বাস আরো গভীর হয়।

এই ঘটনার পর ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক পরিবার তা গ্রহণ করেননি। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর এক বার্তা। তারা অর্থের বিনিময়ে সন্তানের জীবনকে মূল্যায়ন করতে চাননি; তারা চেয়েছেন রাষ্ট্র তাদের বেদনার প্রতি সম্মান দেখাক, দায় স্বীকার করুক এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুক। গুরুতর আহত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক পরিচর্যা ও শিক্ষাজীবন পুনর্গঠনের দায়িত্বও রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না। একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব দুর্ঘটনার দিনেই শেষ হয়ে যায় না; বরং সেদিন থেকেই প্রকৃত দায়িত্বের শুরু।

এই দুর্ঘটনা আমাদের নিরাপত্তা-ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতাও সামনে এনেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার আকাশপথে ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় বহু আগেই এসেছে। দুর্ঘটনার পর প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও সেটি যেন সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা হয়ে না থাকে। প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতি, কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং এমন একটি কাঠামো, যেখানে মানুষের জীবন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। কোনো প্রশিক্ষণ, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন কিংবা কোনো প্রশাসনিক সুবিধাই শিশুদের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।

মাইলস্টোনের এই ট্র্যাজেডি আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়-দুর্ঘটনার পর আবেগঘন প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই রাষ্ট্রের প্রকৃত পরীক্ষা। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, দায় নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় আইন ও নীতির সংস্কার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়সংগত পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা-এসবই হতে হবে রাষ্ট্রের অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য অঙ্গীকার। একই সঙ্গে এই ঘটনার স্মৃতি এমনভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারকেরা প্রতিনিয়ত স্মরণ করেন-একটি অবহেলা কত শত স্বপ্নকে মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিতে পারে।

মাইলস্টোনের শ্রেণিকক্ষে যে জীবনগুলো নিভে গেছে, তারা আর ফিরে আসবে না। কিন্তু রাষ্ট্র চাইলে তাদের অকালপ্রয়াণকে অর্থবহ করতে পারে। সেটি সম্ভব হবে কেবল সত্য প্রকাশের সাহস দেখিয়ে, জবাবদিহি নিশ্চিত করে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং এমন এক নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গড়ে তুলে, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশু বিদ্যালয়ে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হবে না।

এই ট্র্যাজেডি ইতিহাসের একটি বেদনাময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব এটিকে কেবল শোকের স্মৃতি হিসেবে রেখে দেওয়া নয়; বরং এটিকে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার এক কঠিন শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তার শোকপালনে নয়, বরং সেই শোকের পুনরাবৃত্তি রোধে তার দৃঢ়, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপে।
সানা/আপ্র/২২/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই আরো সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে শোকাহত পরিবারের...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি
২৮ অক্টোবর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থান জরুরি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফন নিয়ে বিরোধ, বাউলশিল...

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
২৭ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের হাত বাঁধা রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে?

থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অ...

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক
২৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশু নিপীড়নের বিচার হোক, মাদ্রাসায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক

একটি শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর সময় কোনো মা-বাবা কি কখনো কল্পনা করেন, সুশিক্ষা ও নিরাপদ ভবিষ্য...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে