গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

স্কুল ফিডিংয়ে বাড়ছে উপস্থিতি, মনোযোগ

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:১২ পিএম, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৬:২৪ এএম ২০২৬
স্কুল ফিডিংয়ে বাড়ছে উপস্থিতি, মনোযোগ
ছবি

ছবি সংগৃহীত

সকাল সাড়ে ১০টা। আনোয়ারা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষে টিফিনের অপেক্ষায় বসে আছে খুদে শিক্ষার্থীরা। ঘণ্টা বাজতেই বিদ্যালয়ের সহকারী সোহরাব হোসেন তাদের হাতে তুলে দেন দুটি করে বনরুটি ও একটি করে সেদ্ধ ডিম। একই খাবার পেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে শিশুরা।

খাবার খাওয়া শেষে প্যাকেট ও ডিমের খোসা শ্রেণিকক্ষে রাখা ময়লার বিনে ফেলে দেয় তারা। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একই নিয়মে খাবার পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। সপ্তাহে পাঁচ দিনের খাদ্যতালিকায় তিন দিন বনরুটি ও ডিম, এক দিন বনরুটি ও ইউএইচটি দুধ এবং এক দিন ফর্টিফাইড বিস্কুট ও কলা দেওয়া হচ্ছে।

আনোয়ারা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৩৬৭ জন শিক্ষার্থীই বর্তমানে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।

প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থী রুমাইসা চৌধুরী ঈসাল জানায়, টিফিনের খাবার তার ভালো লাগে। তবে দুধ, বিস্কুট ও কলা তার সবচেয়ে পছন্দ। বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়াটাও তার কাছে আনন্দের।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেশের আট বিভাগের ১৫০টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে চলছে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম। চট্টগ্রাম বিভাগের ১৩টি উপজেলায় বর্তমানে প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।

২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী স্কুল ফিডিং বা মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় প্রায় এক কোটি ১০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয় চলাকালীন পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপস্থিতি বাড়ানো, ঝরে পড়া রোধ এবং পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।

আনোয়ারায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী

চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে শুধু আনোয়ারা উপজেলায় গত ২৯ মার্চ থেকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু হয়েছে। উপজেলার ১১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী নিয়মিত এ কর্মসূচির আওতায় খাবার পাচ্ছে।

কর্মসূচির শুরুতে স্বদেশপল্লী নামের একটি বেসরকারি সরবরাহকারী সংস্থা বনরুটি, কলা ও সেদ্ধ ডিম সরবরাহ করত। বর্তমানে স্বদেশপল্লীর পাশাপাশি প্যারাগণ ইউএইচটি দুধ এবং প্রাণ কোম্পানি ফর্টিফাইড বিস্কুট সরবরাহ করছে।

কার্যক্রম তদারকিতে পাঁচ সদস্যের একটি ‘মাদার্স কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এতে তিনজন মা, একজন বাবা এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রয়েছেন। কমিটির সদস্যরা প্রতিদিন সরবরাহকারীর কাছ থেকে খাবার বুঝে নেওয়ার সময় মান ও পরিমাণ পরীক্ষা করেন। কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে খাবার পরিবর্তন করে নেওয়া হয়।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হিন্দোল বারী বলেন, স্কুল ফিডিং চালুর পর বিদ্যালয়গুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আগে কর্মজীবী মায়েদের ব্যস্ততা ও অনেক পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কিছু শিশু খালি পেটে বিদ্যালয়ে আসত। এতে শ্রেণিকক্ষে তাদের মনোযোগ কম থাকত। এখন বিদ্যালয়ে খাবার পাওয়ায় শিশুরা বেশি মনোযোগী ও উৎফুল্ল থাকছে।

তিনি বলেন, আগে অনেক শিক্ষার্থী টিফিনের সময় বিদ্যালয় থেকে চলে যেত। স্কুল ফিডিং চালুর পর এ প্রবণতা অনেকটাই কমেছে। শিক্ষার্থীরা এখন সারিবদ্ধভাবে খাবার গ্রহণ করছে এবং খাবার শেষে প্যাকেট ও উচ্ছিষ্ট নির্ধারিত বিনে ফেলছে। এতে তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে উঠছে। একই ধরনের খাবার পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতার বোধও তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করাতে অভিভাবকদের আগ্রহ বেড়েছে।

উপস্থিতি বেড়েছে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রোমেনা আক্তার খানম বলেন, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালুর পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও এখন তা বেড়ে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

বীরপুর এলাকার বাসিন্দা মায়েশা বিনতে অয়ন বলেন, এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থাকা শিশুদের জন্য কর্মসূচিটি উপকারী। আগে সন্তান স্কুলে অভুক্ত থাকবে কি না, তা নিয়ে চিন্তা করতে হতো। এখন সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে।

মাদার্স কমিটির সদস্য আরজু আক্তার বলেন, শুরুতে খাবারের মান নিয়ে কিছুটা সমস্যা ছিল। বিশেষ করে কলার মান নিয়ে অভিযোগ পাওয়া যেত। তবে এখন সমস্যা অনেকটাই কমেছে। সরবরাহকারী সকাল ৯টার দিকে খাবার পৌঁছে দেন। কমিটির সদস্যরা প্রথমে খাবারের মান যাচাই করেন। কোনো সমস্যা থাকলে তা সরবরাহকারীকে জানিয়ে পরিবর্তন করে নেওয়া হয়।

অভিভাবক দীপক দাশ বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খাবারের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিশুরা যেন খাবার খেয়ে অসুস্থ না হয় এবং খাবার যেন পুষ্টিকর হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। একই ধরনের খাবার বারবার দেওয়ার পরিবর্তে খাদ্যতালিকায় আরো বৈচিত্র্য আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দেশজুড়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা

চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহাম্মদ বলেন, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করা হয়েছে। এতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান শিক্ষক ও খাবার সরবরাহকারীরা যুক্ত রয়েছেন। খাবার সরবরাহসহ পুরো প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে তদারকি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততাও বাড়ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানে পাইলট আকারে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চলছে। এর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে আগামী জানুয়ারি থেকে দেশব্যাপী কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, শিশুদের বয়সভিত্তিক দৈনিক ও সাপ্তাহিক পুষ্টির চাহিদা বিবেচনা করে গবেষণার মাধ্যমে খাদ্যতালিকা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা ও ভারতের তামিলনাড়ুর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে মায়েদের সম্পৃক্ততায় রান্না করা খাবার সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে শাকসবজি, ডিম, মাছসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে মায়েদের মাধ্যমে রান্না ও সরবরাহের সম্ভাব্য মডেল পরীক্ষায় শিগগিরই একটি পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে।

শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও মনোযোগ বাড়ানো, ঝরে পড়া রোধ এবং শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এগিয়ে চলছে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি। আনোয়ারায় পাইলট কার্যক্রমে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। দেশব্যাপী এ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী ধরে রাখা ও ঝরে পড়া রোধে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এসি/আপ্র/০৮/০৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

এইচএসসির ফল জানার পদ্ধতি পরিবর্তন, জেনে নিন নতুন নিয়ম
২৯ অক্টোবর ২০২৬

এইচএসসির ফল জানার পদ্ধতি পরিবর্তন, জেনে নিন নতুন নিয়ম

মোবাইল ফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল জানার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ...

বাঁশপাতার চায়ের উদ্ভাবনী ধারণায় দেশসেরা বেরোবির দুই শিক্ষার্থী
২৯ অক্টোবর ২০২৬

বাঁশপাতার চায়ের উদ্ভাবনী ধারণায় দেশসেরা বেরোবির দুই শিক্ষার্থী

বেরোবি প্রতিনিধি: বাঁশপাতা থেকে পরিবেশবান্ধব চা তৈরির উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা উপস্থাপন করে জাতীয় পর...

জাবির ভর্তি পরীক্ষা ১০ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত
২৮ অক্টোবর ২০২৬

জাবির ভর্তি পরীক্ষা ১০ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত

মাহফুজ আলম সোহাগ, জাবি প্রতিনিধি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক...

এইচএসসির ফল প্রকাশের তারিখ পরিবর্তন
২৭ অক্টোবর ২০২৬

এইচএসসির ফল প্রকাশের তারিখ পরিবর্তন

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) এ তথ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে