চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি ও হিসাববিজ্ঞানে অধিকাংশ বোর্ডে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে তুলনামূলক ভালো ফল হলেও কয়েকটি বোর্ডে পাসের হার ৭০ শতাংশের নিচে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি, মানসম্মত শিক্ষকের সংকট, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ এবং প্রয়োজনীয় ল্যাব ও শিক্ষা উপকরণের অভাব এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ইংরেজি, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মূলত দক্ষতানির্ভর বিষয়। এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার পেছনে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠদানে নিয়োজিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১০ বছরের যে শিখনঘাটতি নিয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিকে আসে, তা মাত্র দুই বছরের সীমিত সময়ে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ এবং প্রয়োজনীয় ল্যাব ও সরঞ্জামের অভাব শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক ভিত্তি তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করছে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মতে, ভাষাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে না উঠে নতুন বিষয়ে গুরুত্ব বাড়ানোর চেয়ে মাতৃভাষা বাংলা ও মৌলিক ইংরেজি শিক্ষার মান উন্নয়ন এখন বেশি জরুরি।
ইংরেজিতে অধিকাংশ বোর্ডে পাসের হার ৭০ শতাংশের নিচে: ইংরেজি বিষয়ে ঢাকা বোর্ডে ২ লাখ ৮২ হাজার ৪০৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে এ বিষয়ে পাসের হার ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে শুধু ঢাকা বোর্ডে।
চট্টগ্রাম বোর্ডে ৯৯ হাজার ৮৫১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাসের হার ৬৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সিলেট বোর্ডে ৪২ হাজার ৬৭২ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৬৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। কুমিল্লা বোর্ডে ৯২ হাজার ১৬২ জনের পাসের হার ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
ময়মনসিংহ বোর্ডে ৬৩ হাজার ৯৬৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাসের হার ৫৯ দশমিক ১১ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৭৪ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৫৬ দশমিক ০১ শতাংশ। দিনাজপুর বোর্ডে ১ লাখ ৬ হাজার ২২৬ জনের পাসের হার ৫৬ দশমিক ০৫ শতাংশ।
যশোর বোর্ডে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৩৯ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৫৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। বরিশাল বোর্ডে ৫২ হাজার ৮৬৭ জনের পাসের হার ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে তুলনামূলক ভালো ফল: তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ছয়টিতে পাসের হার ৭০ শতাংশের বেশি। ঢাকা বোর্ডে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৬২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৭৬ দশমিক ১৯ শতাংশ।
সিলেট বোর্ডে ৪০ হাজার ৬৪৪ জনের পাসের হার ৭৪ দশমিক ২০ শতাংশ। চট্টগ্রাম বোর্ডে ৯৯ হাজার ৮৫১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৭৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। কুমিল্লা বোর্ডে ৯২ হাজার ১১৬ জনের পাসের হার ৭৩ দশমিক ০১ শতাংশ।
দিনাজপুর বোর্ডে ৯১ হাজার ২১৪ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৭২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ময়মনসিংহ বোর্ডে ৬১ হাজার ৯৬০ জনের পাসের হার ৭১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫২০ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৬৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। যশোর বোর্ডে ৮৭ হাজার ২৭৯ জনের পাসের হার ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বরিশাল বোর্ডে ৫১ হাজার ৫৫০ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ।
হিসাববিজ্ঞানে বোর্ডভেদে বড় ব্যবধান: ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে ফলাফলেও বোর্ডভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। এ বিষয়ে ঢাকা বোর্ডে ৫৭ হাজার ৩৪১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৭৯ দশমিক ২২ শতাংশ। চট্টগ্রাম বোর্ডে ২৭ হাজার ১২৩ জনের পাসের হার ৮১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। নয়টি বোর্ডের মধ্যে এ দুটি বোর্ডে পাসের হার তুলনামূলক বেশি।
যশোর বোর্ডে ৯ হাজার ৫৮২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৭৬ দশমিক ২২ শতাংশ। কুমিল্লা বোর্ডে ২২ হাজার ৩৪৪ জনের পাসের হার ৭৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
সিলেট বোর্ডে ৪ হাজার ৩৩৫ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৬২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ময়মনসিংহ বোর্ডে ৪ হাজার ২৫১ জনের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
দিনাজপুর বোর্ডে ৬ হাজার ১১৩ জনের পাসের হার ৫৩ দশমিক ০২ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে ৯ হাজার ৭৪৫ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৫২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বরিশাল বোর্ডে ৪ হাজার ৯৭৭ জনের পাসের হার ৫২ দশমিক ২০ শতাংশ।
বিষয়ভিত্তিক এ ফলাফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের মান, শিক্ষকসংকট এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ নয়, শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি কোথায় এবং কেন তৈরি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ধারাবাহিক ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
সানা/আপ্র/৩১/১০/২০২৬