গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

মেনু

মন্তব্য প্রতিবেদন=============

সংহতির সুরে জাগলো লাখো জনতা; তারুণ্যের উচ্ছ্বাস জানিয়ে দিলো, সংস্কৃতির পথ রুদ্ধ করা যাবে না

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ২১:৫৩ পিএম, ০৮ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২২:৩৮ এএম ২০২৬
সংহতির সুরে জাগলো লাখো জনতা; তারুণ্যের উচ্ছ্বাস জানিয়ে দিলো, সংস্কৃতির পথ রুদ্ধ করা যাবে না
ছবি

৭ নভেম্বর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত ‘কনসার্ট ফর সলিডারিটি’র ছবি

ধানের দেশ, গানের দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও জীবনযাপনের সঙ্গে সংগীতের সম্পর্ক হাজার বছরের। নদীর কলতান, রাখালের বাঁশি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, বাউল, জারি-সারি থেকে আধুনিক ব্যান্ডসংগীত-সুরের বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সময় বদলেছে, বদলেছে প্রজন্মের রুচি ও সংগীতের প্রকাশভঙ্গি; কিন্তু গানপ্রিয় বাঙালির হৃদয়ে সুরের আবেদন একটুও ম্লান হয়নি। একবিংশ শতকের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতেও এই চিরায়ত সত্য যে কতটা প্রাণবন্ত, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলো ৭ নভেম্বর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত ‘কনসার্ট ফর সলিডারিটি’।

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে সুবিশাল এই সড়ক যেন সেদিন পরিণত হয়েছিল মানুষের এক অপরিমেয় আনন্দসমুদ্রে। ঠিক কত লাখ দর্শক-শ্রোতার সমাগম ঘটেছিল, তার নির্ভুল হিসাব হয়তো দেওয়া সম্ভব নয়। তবে দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের অবিরাম উপস্থিতি; মোহাম্মদপুরের কলেজগেট থেকে আসাদগেট হয়ে ধানমন্ডি ২৭, খামারবাড়ি মোড় ছাড়িয়ে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া জনস্রোত এবং প্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে হাজারো কণ্ঠের সম্মিলিত গানে একটি বিষয় স্পষ্ট-বাংলাদেশের মানুষ গান ভালোবাসে, সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, মুক্ত পরিবেশে আনন্দ উদ্যাপন করতে চায়।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় এবং বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অংশ নেয় সাতটি জনপ্রিয় ব্যান্ড-মেকানিক্স, শিরোনামহীন, আর্টসেল, ফিডব্যাক, ওয়ারফেজ, মাইলস ও নগরবাউল জেমস। বিকেল সাড়ে তিনটায় শুরু হওয়া সাত ঘণ্টার এই সংগীত আয়োজনের প্রতিটি পর্বেই ছিল দর্শকদের উচ্ছ্বাস, আবেগ ও ভালোবাসার অভূতপূর্ব প্রকাশ।

বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে ব্যান্ডসংগীতের প্রতি নতুন প্রজন্মের বিপুল আকর্ষণ। একসময় পাশ্চাত্য সংগীতধারার প্রভাবে বিকশিত এই সংগীত এখন বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হেভি মেটাল থেকে রক, আধুনিক ব্যান্ডের নিজস্ব সুর ও কথায় তরুণেরা খুঁজে পাচ্ছে তাদের স্বপ্ন, প্রতিবাদ, ভালোবাসা ও জীবনবোধ। শিরোনামহীনের গানে হাজারো মানুষের কণ্ঠ মেলানো কিংবা ওয়ারফেজের জনপ্রিয় গানে দর্শকদের উন্মাদনা তারই প্রমাণ।

আর নগরবাউল জেমসের পরিবেশনা ছিল যেন সেই আবেগের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। রাত ১০টার দিকে তিনি মঞ্চে উঠতেই জনসমুদ্রে যে উচ্ছ্বাসের ঢেউ উঠেছিল, তা বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ‘কবিতা তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে’, ‘গুরু’, ‘মা’, ‘বাংলাদেশ’, ‘তারায় তারায়’সহ জনপ্রিয় গানগুলোতে দর্শকদের উন্মাদনা প্রমাণ করেছে, জেমস কেবল একজন জনপ্রিয় শিল্পী নন, তিনি কয়েক প্রজন্মের আবেগ ও ভালোবাসার নাম। সাধারণত তাঁর কনসার্ট উপভোগ করতে দর্শকদের টিকিট কিনতে হয়। অথচ এই আয়োজন ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। ফলে ঢাকা ছাড়াও আশপাশের জেলা ও শহরতলি থেকে অসংখ্য মানুষ এসেছিলেন প্রিয় শিল্পীদের গান শুনতে।

তবে এই আয়োজনের তাৎপর্য নিছক একটি সফল সংগীতানুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গানবাজনা ও বিনোদনমূলক আয়োজনে এক শ্রেণির মানুষের বাধা দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। কোথাও শিল্পীদের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চাপ দেওয়া হয়েছে, কোথাও সংগীতচর্চার স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এসব ঘটনা শিল্পীসমাজের মনোজগতে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা, হতাশা ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যে দেশে সংগীত মানুষের আত্মপরিচয় ও জীবনবোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে শিল্পীর কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা কোনোভাবেই সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশের পরিচায়ক হতে পারে না।

এই বাস্তবতায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সরকারের এমন একটি বৃহৎ উন্মুক্ত সংগীত আয়োজন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছেছে-বাংলাদেশে মানুষ স্বাধীনভাবে গান গাইবে, নাচবে, শুনবে, আনন্দ করবে এবং নিজের সাংস্কৃতিক জীবন উদ্যাপন করবে। মানুষের জীবন থেকে আনন্দ ও বিনোদনের অধিকার কেড়ে নেওয়ার নাম রাজনীতি হতে পারে না, ধর্মও হতে পারে না। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও বহুত্ববাদই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি।

তবে একটি সফল কনসার্ট আয়োজনই সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। এ স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করতে হবে। দেশের প্রত্যেক জেলায় নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ও স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং বাধাদানকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিল্পীদেরও নিরাপদ পরিবেশে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের এই জনসমুদ্র আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, তারুণ্যকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, সুরের মূর্ছনায়ও ঐক্যবদ্ধ করা যায়। সংহতি কেবল রাজনৈতিক ঐক্যের নাম নয়; মানুষের হৃদয়ের মিলন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্যেও সংহতির গভীরতম প্রকাশ ঘটে। কয়েক লাখ তরুণ-তরুণীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেই সত্যই উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশের আকাশে আবারো স্বাধীন সুরের পতাকা উড়ুক। শিল্পীর কণ্ঠ হোক নির্ভীক, সংস্কৃতির পথ হোক বাধামুক্ত। কারণ গান থেমে গেলে কেবল একটি সুরের মৃত্যু হয় না, মানুষের আনন্দ, স্বপ্ন ও মুক্তচিন্তারও ক্ষতি হয়। যে বাংলাদেশ গান ভালোবাসে, সেই বাংলাদেশই উদার, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাক। সংহতির এই সুর ছড়িয়ে পড়ুক দেশের প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। 
লেখক: বার্তা সম্পাদক, আজকের প্রত্যাশা; সাংস্কৃতিককর্মী। 
সানা/আপ্র/৮/১১/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

পুরুষ ললিপপের মতো: পারশা
০৮ নভেম্বর ২০২৬

পুরুষ ললিপপের মতো: পারশা

বিয়ের খবর প্রকাশ্যে এনেই আলোচনায় এসেছিলেন তরুণ সংগীতশিল্পী ও অভিনেত্রী পারশা মাহজাবিন। তবে বরের পরিচ...

প্রিয়াঙ্কার নতুন ঘোষণা, আসছে ‘ভেন্টিলেটর ২’
০৮ নভেম্বর ২০২৬

প্রিয়াঙ্কার নতুন ঘোষণা, আসছে ‘ভেন্টিলেটর ২’

২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া মারাঠি সিনেমা ‘ভেন্টিলেটর’-এর সিক্যুয়েল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন বলিউড অভিনেত্...

সুইজারল্যান্ডে পুরস্কৃত বাংলাদেশের ‘অ্যানি’
০৮ নভেম্বর ২০২৬

সুইজারল্যান্ডে পুরস্কৃত বাংলাদেশের ‘অ্যানি’

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা সিরিজের পুরস্কার জিতেছে মিনিসিরিজ ‘অ্যানি’।...

এবার তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা, তদন্তে পিবিআই
০৮ নভেম্বর ২০২৬

এবার তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা, তদন্তে পিবিআই

মানহানির অভিযোগে অভিনেত্রী তানজিন নাহার তিশার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। রোববার (০৮ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রো...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

গণহত্যাকারীদের আর রাজনীতি করতে দেবে না জনগণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দেশে গণহত্যা, হত্যাকাণ্ড ও আলেম-ওলামাদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ফ্যাসিবাদী শক্তিকে জনগণ আর রাজনীতি করতে দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এবং এখনো নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ না করা ব্যক্তিরা বাংলাদেশে ফিরে রাজনীতি করতে পারবেন না। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভায় আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরী মাদ্রাসার ১০৪তম বার্ষিক দ্বীনি মহাসম্মেলন ও দস্তারবন্দী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, মন্ত্রীর এই বক্তব্য সঠিক বলে মনে করেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে