বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষকেরা। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে তীব্র পানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে পানি নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন স্থানীয় কৃষক ও গবেষকেরা।
দশকের পর দশক ধরে গভীর নলকূপের মাধ্যমে এ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদনে বড় পরিবর্তন এলেও এখন সেই ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলো দ্রুত নিঃশেষ হচ্ছে। আগে যে এলাকা খরাপ্রবণ ছিল, তা একসময় সারা বছর ধান, গম, ভুট্টা ও সবজি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চলে পরিণত হয়।
কিন্তু বর্তমানে বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে গেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলটির বেশির ভাগ এলাকাই তীব্র পানি সংকটে পড়েছে। ফলে সেচের খরচ বাড়ছে এবং পানির প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, আগের তুলনায় এখন অনেক গভীরে পাইপ বসিয়েও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় মোটর চালিয়েও পানি ওঠে না। এমনকি শুষ্ক মৌসুমে খাবার পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে।
কৃষকেরা বলছেন, সেচ খরচ বৃদ্ধি, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পানির জন্য বিরোধ বাড়ায় গ্রামীণ জীবনে চাপ বাড়ছে। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, ভবিষ্যতে পানি নিয়ে সংঘাতের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
সরকার এক পর্যায়ে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার কয়েক হাজার গ্রামে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এসব এলাকা ‘পানি সংকটাপন্ন অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে কৃষকদের চাপের মুখে ওই সিদ্ধান্ত আংশিকভাবে স্থগিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। একজন পানি বিশেষজ্ঞের মতে, কৃষকদের জন্য এখনো কোনো সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ নেই।
বরেন্দ্র অঞ্চল উঁচু সমতলভূমি হওয়ায় এখানে বৃষ্টিপাত কম এবং মাটি সহজে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সেচের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ আরো বেড়েছে।
কৃষকেরা জানান, বোরো ধানের মতো অধিক পানি নির্ভর ফসলের কারণে পানির ব্যবহার আরো বেড়েছে। এতে উৎপাদন বাড়লেও ভবিষ্যৎ টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, সেচ ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়, আবার অতিরিক্ত পানি উত্তোলন কৃষির ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকিতে ফেলছে। অনেক তরুণ ইতোমধ্যে জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে বলেও জানান তারা।
গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে, আগামী দুই দশকে এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এতে বড় পরিসরের কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়া এবং খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থা পানি সাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। এর মধ্যে ‘বিকল্প ভেজা ও শুকনা সেচ পদ্ধতি’ উল্লেখযোগ্য, যেখানে ধানের জমিতে সবসময় পানি না রেখে পর্যায়ক্রমে সেচ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পানি সরবরাহ নয়, কমিউনিটি ভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, কম পানি লাগে এমন ফসল এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে বিনিয়োগ জরুরি। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সানা/আপ্র/১১/৬/২০২৬